রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারো রক্তাক্ত পশ্চিমবঙ্গ। গতকাল চতুর্থ দফায় ভোটগ্রহণের দিনে নিহত হয়েছেন পাঁচ জন। এদিন কোচবিহারের শীতলকুচিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে চার জন নিহত হন। নিহতরা সকলেই তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক বলে দলটি দাবি করেছে। এর আগে সকালে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর দফায় দফায় শীতলকুচিতে সংঘর্ষ হয় তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে। পাঠানটুলী শালবাড়ীতে ভোট দিতে গিয়ে সংঘর্ষে আনন্দ বর্মণ নামে এক জন নিহত হন। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতায় ১০ জন নিহত হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হত্যাকাণ্ডের জন্য তৃণমূল নেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, মমতার উসকানিতেই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তবে মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলি চালানোর পেছনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ষড়যন্ত্র রয়েছে। তিনি অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক বিবেক দুবে নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী আত্মরক্ষার্থেই গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে এবার আট দফায় ভোটগ্রহণ হবে। গতকাল চতুর্থ দফায় ৫ জেলার ৪৪ আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী গতকাল ভোট পড়েছে ৭৮ শতাংশ। এই হার আরো কিছুটা বাড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে উত্তরবঙ্গের জেলা কোচবিহারেই। এই কোচবিহারে সহিংসতাও বেশি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে সেখানে নিহত হয়েছেন চার জন। শীতলকুচির জোড়পাটকির ১২৬ নম্বর বুথের বাইরে এই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আরো চার জন আহত হয়েছেন। হতাহতরা সকলেই তৃণমূলের সমর্থক বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় বাহিনী বিজেপির হয়ে কাজ করছে। রাতভর মদ-মাংস খেয়ে সকালে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন করানোর ভার যাদের কাঁধে, তাদের নির্বিচারে গুলি চালানোর অধিকার কে দিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এছাড়া ভোট দিতে গিয়ে ১৮ বছরের এক তরুণ নিহত হয়েছেন। নিহতের পরিবার নিজেদের বিজেপি সমর্থক দাবি করেছে।
স্থানীয় এক তৃণমূল কর্মী গণমাধ্যমকে বলেন, দলে দলে মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছিলেন। সেই সময় বিনা উসকানিতে কেন্দ্রীয় বাহিনী গুলি চালায়। বুথের ভেতরে যে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন ছিল, তারাই এই ঘটনা ঘটিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ইশারায় কেন্দ্রীয় বাহিনী এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শীতলকুচির তৃণমূল প্রার্থী পার্থপ্রতিম রায়। তিনি বলেন, আজকের ঘটনার জন্য নির্বাচন কমিশন দায়ী। দায়ী বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তবে বিজেপি নেতা নিশীথ প্রামাণিক গোটা ঘটনার জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লাগাতার উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন মমতা। মাথাভাঙা, শীতলকুচি, কোচবিহারের সভা থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঘিরে ধরতে বলেন তিনি। তাতেই একটি বিশেষ শ্রেণির লোক উত্তেজিত এবং আক্রমণাত্মক হয়ে পড়েন।
গোটা ঘটনার রিপোর্ট চেয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন জানিয়েছে, সিআরপিএফ নয়, গুলি চালিয়েছে সিআইএসএফ (সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্স)। নির্বাচন কমিশনার সুদীপ জৈন বিষয়টি নিয়ে ফোনে প্রাথমিক রিপোর্ট নিয়েছেন। কী কারণে গুলি চালাতে হলো, কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা গেল না, সব সমেত পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তলব করেছেন তিনি।
রাজ্য নির্বাচন পর্যবেক্ষক বিবেক দুবে নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন, তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল। ভোটদানে বাধা দেওয়া হচ্ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঘিরে ধরা হয়। রাইফেল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়। আত্মরক্ষার্থেই কেন্দ্রীয় বাহিনী গুলি চালিয়েছে। তবে বিভিন্ন মহল বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাধ্য হয়ে যদি গুলি চালাতে হয়, তাহলে পায়েও তো গুলি চালাতে পারত। সেটা না করে সোজাসুজি বুকে গুলি করা হলো কেন?
হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরীও। তিনি বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেভাবে খুনোখুনি হচ্ছে, তা চিন্তার বিষয়। আমরা নিশ্চয়ই বিষয়টি দেখব। এ ঘটনার নিন্দা করেছে সিপিএম। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি টুইট করে বলেছেন,? কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভোটারদের ওপর গুলি চালানো এবং তাতে চার জনের মৃত্যু ভয়ানক ঘটনা, অত্যন্ত নিন্দনীয়। নির্বাচন কমিশনের উচিত উচ্চ পর্যায়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা। এ ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হবে।
এদিকে, অন্য এলাকাগুলোতে বিজেপির দুই প্রার্থী লকেট চ্যাটার্জি ও পায়েল সরকারের গাড়িতে হামলা হয়। বেশ কয়েকটি জায়গায় ভোটারদের ভোট না দিতে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তারই মধ্যে উত্সবের মেজাজে ভোট দেন বেহালা পশ্চিম কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী শ্রাবন্তী চ্যাটার্জি, সস্ত্রীক সৌরভ গাঙ্গুলি, রঞ্জিত মল্লিক, কোয়েল মল্লিক, শুভম্রী, রাজ চক্রবর্তী, রূপা গাঙ্গুলি, সংগীত শিল্পী অনুপম রায়।
মমতার উসকানিতেই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে :মোদি
কোচবিহারের শীতলকুচিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে চার জনের নিহতের ঘটনায় মমতা ব্যানার্জিকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, মমতা নিজের কর্মীদের ট্রেনিং দিচ্ছেন। ১০ বছর সরকার চালানোর পরে শেখাচ্ছেন, কেমন করে নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘেরাও করতে হয়, কীভাবে নিরাপত্তা বাহিনীকে পেটাতে হয়, আর কেমন করে বুথে হামলা করতে হয়। গদি চলে যাচ্ছে দেখে তিনি এই স্তরে নেমে এসেছেন।
শনিবার এক জনসভায় মোদি বলেন, কোচবিহারে যা হয়েছে, সেটা অত্যন্ত দুঃখজনক। হতাহতের ঘটনায় আমি দুঃখ প্রকাশ করছি, সমবেদনা জানাচ্ছি। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারির সুরে বলেন, আমি তৃণমূলকে আর তাদের গুন্ডাদের সাফ সাফ বলছি, ওরা যা চাইবে তাই হবে এমনটা আর চলবে না। এর পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের কাছে তদন্তের আর্জিও জানিয়েছেন মোদি। তিনি বলেন, কোচবিহারে যা হয়েছে তাতে দোষীদের কড়া সাজা দেওয়া হোক। গতকাল শিলিগুড়িতে এক জনসভায় মোদি তৃণমূলের বিরুদ্ধে তফসিলিদের ‘ঘৃণা’ করার অভিযোগ তোলেন।
গুলি চালানোর ষড়যন্ত্রকারী
অমিত শাহ :মমতা
গতকাল এক সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি শীতলকুচির ঘটনা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, আমি কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দোষ দিই না। তারা এক জনের নির্দেশে চলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে চলে। নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকলেও তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা শুনতে হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত। তিনি বলেন, রবিবার সকালে আমি মাথাভাঙা হাসপাতালে যাব। সেখানেই সবার মরদেহ রাখা আছে। তিনি বলেন, আমি সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বলব, সব বিরোধীকে বলব, দেখুন কীভাবে এরা ভোট চালায়। কীভাবে বিজেপি ভোট চালায়। এটা গণতন্ত্রের লজ্জা।