সুপ্তি জামান
চাতককে বলা হয় পৌরাণিক পাখি। যে পাখি কখনো মাটিতে নামে না, উঁচু গাছের মগডালে বসে আকাশপানে হা করে থাকে, বৃষ্টিজলেই সে তৃষ্ণা মেটাবে, যতদিন বৃষ্টি না হয় চাতক পানি পান করে না। একসময় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। চাতক তখন বৃষ্টির জন্য চিত্কার করে, তবু বৃষ্টি হয় না। তখন চাতকের গলা দিয়ে আগুনের ফুলকি বের হয়—চাতককে নিয়ে এই হলো পৌরাণিক কাহিনি। তবে আমরা চাতকে চিনি তৃষ্ণার্তের অপেক্ষার রূপক হিসাবে। চাতক এসেছে মরমি সাধক লালনের গানে, এমন তৃষ্ণা যা কেবল মানুষই বোধ করে, আর করে পৌরাণিক চাতক। আবার এই চাতকই পাকড়া পাপিয়া হিসেবে পরিচিত। নজরুলের পাপিয়া বা পিউকাঁহাই আবার কোকিল। কোকিলের দূর সম্পর্কের জ্ঞাতিভাই পাকড়া পাপিয়া। কোকিল গোত্রের পাখির রয়েছে নানা রকমের প্রকরণ। তবে পাপিয়ার নাম শুনলেই বসন্ত দিনের মন উদাসী কুহুতানের কথা মনে পড়ে।
বসন্ত দিনে গ্রামবাংলার পথে হাঁটলেই এলোকেশি বাতাস আর পাপিয়ার কুহুডাকে হুহু করে ওঠে মানুষের হূদয়—কী যেন নেই, কী যেন কোথায় হারিয়ে গেছে, কী যেন খুঁজে ফিরি পথে পথে...। এই পাকড়া পাপিয়া বা চাতক আবার পরিযায়ী পাখি, বেশিরভাগ সময়ে আমাদের দেশে থাকে, শীতে উড়ে যায় সুদূর আফ্রিকায়। শীত শেষে ফিরে আসে আগের বসতভিটায়। পাকড়া পাপিয়াও কিন্তু নিজে বাসা বোনার ঝক্কিঝামেলা এড়িয়ে ছাতারে পাখির বাসায় ডিম পাড়ে, ছাতারে পাখি বুঝতেও পারে না, যখন বুঝতে পারে ততদিনে সে উড়তে শিখে যায়।
পৌরাণিক চাতক মাটিতে না নামলেও বাংলার চাতক মাটিতে নামে, শস্যখেতের আলে বসে, পোকামাকড় খায় আর মন উদাস করা কুহুতানে মুখর করে রাখে বনভূমি। তবে ক্ষুদ্রাকৃতির এই পাখি উড়তে ভালোবাসে, আকাশে মেঘ দেখলে খুব চঞ্চল হয়ে ওঠে চাতকের মন, যেন মেঘ ছুঁয়ে দেবে, উড়তে উড়তে আকাশের অনেক উঁচুতে উঠে যায়, যুদ্ধবিমানের মতো মহড়া দিতে থাকে, আকাশের বুকে লুটোপুটি খায় হরষে। বৃষ্টি নামলে উড়তে উড়তেই জল পান করে, উড়তে উড়তে ভাসমান পোকা শিকার করার কৌশলও জানে। উড়ন্ত চাতককে আবার বাজপাখি শিকার করে খায়। চাতক যখন উড়তে উড়তে অনেক ওপরে উঠে যায় তখন ভূমি থেকে দেখলে অতি ক্ষুদ্র মনে হয়। তখন এই চাতকই আবাবিল পাখি!