শিল্পী মিতা হককে ছোটবেলা থেকে কেন ভালোবাসতাম তা জানি না, তার কোনো ব্যাখ্যাও নেই আমার কাছে। যেমন ব্যাখ্যা নেই প্রকৃতি কেন ভালোবাসি, নদীর জল কেন ভালোবাসি, সৃষ্টি কেন ভালোবাসি অথবা এরকম অনেক জিনিস কবে থেকে ভালোবাসি। কিছু কিছু মানুষ আছে দেবী-দেবী, মা-মা, দিদি-দিদি কল্যাণময়ী—অবয়ব দেখলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে, মনের গভীর থেকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। শিল্পী মিতা হক এমনই একজন মানুষ, রুচিশীল মানুষ—যাকে দেখে ভালো না বেসে পারা যায় না। তার অবয়ব, তার কণ্ঠ, তার বাচনভঙ্গি, তার পোশাকপরিচ্ছদ যেন পুরো বাঙালিয়ানা, তিনি যেন মন ও মননে আপাদমস্তক বাঙালি।
আমার দাদা বলেন—‘কিছু কিছু মানুষ আছে তুমি তাকে চেনো না, জানো না অথচ প্রথম দেখাতেই মনে হয় কতকালের চেনা, কত-কত আপন, আত্মার আত্মীয়।’ রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন—‘বলা নেই, কওয়া নেই, দেখামাত্রই যেন মনের অন্দরে প্রবেশ করে পুরো হূদয়-মন দখল করে নেয়।’
আবার কিছু কিছু মানুষ আছে তাকে কোনো দিন চোখে দেখিনি—হয়তো ছবিতে দেখেছি, অথবা দেখেছি কোথাও, কখনো কথা হয়নি, কিন্তু ঐসব লোকের কথা ভাবলেই মনটা বিশ্রীভাবে ঘিনঘিন করে, মনে হয় আজন্মের শত্রু, পারলে এক্ষুনি ঘা মেরে নাক ফাটিয়ে দিই, রাগে শরীর গজগজ করে। মনোবিজ্ঞানে এর কী ব্যাখ্যা আছে আমার জানা নেই, তবে বোধ করি অনেকেই আমার এ কথায় একমত হবেন।
আগেও বলেছি শিল্পী মিতা হককে কবে থেকে, কোন বয়স থেকে ভালোবেসেছি মনে নেই। তবে মনে হয়—কলেজ-জীবনে আমার কোনো এক স্যারের বাসার ওয়ালে সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো লাল পাড়ে হলুদ বুননের শাড়ি, গলায় সাজানো মাটির মালা আর কপাল জোড়া লাল টিপে মধুময় স্নিগ্ধ হাসিতে মিতা হকের একটি ছবি দেখে আবেগে তন্ময় হয়ে গিয়েছিলাম। দেবীর প্রসাদের ধারা যেন শিরশির করে প্রবাহিত হয়েছিল আমার সমস্ত শরীরে। আমার সামনে সেদিন জীবন্ত হয়ে উঠেছিলেন শিল্পী মিতা হক। মনের গহনে মৃদু লয়ে গাইছিলাম—‘তুমি কি কেবলই ছবি/ শুধু পটে আঁকা/ নও ছবি, নও ছবি, নও শুধু ছবি।’ পরে অবশ্য জেনেছিলাম তিনি বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতা হক। আমি রবীন্দ্রসংগীতের ভক্ত, ফলে সেই থেকে আমি ভীষণ ভক্ত হয়ে যাই মিতা হকের। সেই মিতা হক চলে গেলেন সবাইকে ছেড়ে। এই বাস্তবতা বিশ্বাস করতে চায় না মন। আগের থেকেই নানা শারীরিক জটিলতায় থাকা মিতা হককে করোনা ধরেছিল। মুক্তও হয়েছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। মিতা হক শুধু বড় মাপের সংগীতশিল্পীই ছিলেন না, তিনি বড় মাপের মানুষও ছিলেন। তার সেই মানসিকতা গড়ে উঠতে তারই চাচা এবং শিক্ষক ওয়াহিদুল হক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। মিতা হক এই দুর্দিনে রবীন্দ্রসংগীতকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রধান সারিতে দাঁড়িয়ে লড়াই করে গেছেন। রবীন্দ্রসংগীতের এমনিতে শ্রোতাসংখ্যা কম, কিন্তু মিতা হক সাধারণ মানুষ পর্যায়ে রবীন্দ্রসংগীতকে প্রবেশ করিয়েছিলেন। অনেকগুলো রবীন্দ্রসংগীত শুনলেই মিতা হকের কথা মনে পড়ে। বাংলাদেশ এবং ভারত মিলে তার ২৪টি অ্যালবাম রয়েছে। সে অ্যালবামগুলো শ্রোতাদের ব্যাপক বাহবা কুড়িয়েছে।
কিছু কিছু মানুষ অজ্ঞাতে আর অলক্ষ্যেই তার ব্যবহার, তার কথা আর সুর দিয়ে লক্ষ-কোটি মানুষের হূদয়ে জায়গা করে নেন, মিতা হক সেই মাপের কিংবদন্তি। তিনি চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। তার আদর্শ থেকে যাবে এ বাংলার অগণিত মানুষের মনে। তিনি বাংলা সংগীতের ধ্রুব নক্ষত্র, উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, মানুষের ‘মনের মানুষ’। তার শূন্যতা কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়। আমাদের হূদয় জুড়ে তার মহত্ উপস্থিতি তাকে আমাদের মাঝে অমর করে রাখবে। বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি হে অনন্ত অমৃতবাসিনী শিল্পী—মিতা হক।
‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু বিরহ দহন লাগে,
তবু শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’
n লেখক :ব্যাংকার ও কবি