আমেরিকা বা ইউরোপে করোনা ভ্যাকসিন গ্রহণের অনেকগুলি ‘অপশন’ রহিয়াছে। ফাইজার, মডার্না, জনসন, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা প্রভৃতির কোম্পানির টিকার মধ্যে যে কোনো একটি গ্রহণ করিতে পারেন সেইখানকার নাগরিক। কিন্তু আমাদের হাতে কেবল অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড ভ্যাকসিন রহিয়াছে। এই মুহূর্তে করোনা টিকার উত্সব চলিতেছে ভারতে। তবে সেইখানকার পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী ভারতেও নাকি টিকার সংকট রহিয়াছে। এই কারণে আগামী জুন হইতে সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরো পাঁচটি টিকা উত্পাদনকারী সংস্থার নিকট হইতে টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ লইয়াছে ভারত। স্মর্তব্য যে, ভারতের হাতে দুইটি টিকা রহিয়াছে। একটি টিকা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার, যাহার নাম কোভিশিল্ড। অন্যটির নাম কোভ্যাক্সিন, যাহা ভারতের স্থানীয় টিকা উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভারত বায়োটেকের তৈরি। আমাদের টিকা আসিতেছে ভারত হইতেই। কিন্তু আমাদের ‘কোভিশিল্ড’ ব্যতীত অন্য কোনো টিকা গ্রহণের সুযোগ নাই। ইহারও সংকট রহিয়াছে। এই অবস্থায় অনেকেই মনে করেন, আমাদেরও একাধিক টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা করাটা জরুরি। একই সঙ্গে টিকা আমদানি মুক্ত করিয়া দেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ, যাহাতে মনোপলি ব্যাপারটি না থাকে। বর্তমানে আমরা ৮০ শতাংশ আমদানি করিয়া থাকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সুতরাং টিকা আমদানির ক্ষেত্রেও এই ভারসাম্যমূলক নীতি অনুসরণ করা যাইতে পারে। অভিজ্ঞতায় আমরা তো এখন আর শিশুরাষ্ট্র নই। আমরা আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকাল উদ্যাপন করিতেছি। ইহার পরও যদি আমরা পুরাতন ধ্যানধারণা হইতে বাহির হইয়া আসিতে না পারি, তাহা হইলে কবে সাবালক হইব? দুঃখজনকভাবে দেখা যায় যে, উন্নয়শীল বিশ্বে রাষ্ট্রের সম্পদ কয়েক জন ব্যক্তির নিকট কুক্ষিগত হইয়া থাকে। অল্প কিছু ব্যক্তিই সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করিতে চেষ্টা করিয়া থাকেন। যাহারা এইরূপ নিয়ন্ত্রক হন, তাহারা কি চিন্তা করিয়া দেখেন না, এই দিন দিন নয় আরো দিন আছে!
ইতিহাসে অনেক প্রতাপশালীদের পতনের কাহিনি বলিয়া দেয় যে, মধ্যাহ্নের আগুন-ঝরানো সূর্যকেও একটি সময়ে অস্তাচলে ডুবিতেই হয়। পায়ের তলার মাটি কাহারোই চিরকাল শক্ত থাকে না। মাটির বাঁধ দিলে যেমন উহাকে বত্সরে কয়েক বার মেরামত করিতে হয়, নচেত্ মাটির বাঁধ ধসিয়া যায়—সেই কারণে ইহা বলাই যায় যে—মাটির কাজই হইল একটি সময় আসিয়া পায়ের তলা হইতে সরিয়া যাওয়া। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হইল, যতক্ষণ পায়ের তলায় মাটি থাকে ততক্ষণ মনে হয়, ইহা মাটি নহে, পাথর। উহার তলে পানি নহে, কংক্রিট রহিয়াছে। এই কারণে যতক্ষণ ‘ক্ষমতার মাটি’ পায়ের তলায় থাকে, ততক্ষণ অবধি মনে করা হয় ইহা কোনোদিনও ধসিয়া পড়িবে না। একসময় যেমন বলা হইত, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য কখনো অস্ত যাইবে না; মহাপ্রতাপশালী রাজাবাদশারা চিরকালই ভাবিতে ভালোবাসেন—তাহাদের অক্ষয় সময় কখনো ফুরাইবে না। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেই। দুঃখজনকভাবে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর ক্ষমতা হারানোদের এমন সকল অপরাধ-দুর্নীতি-অপকর্মের ফিরিস্তি বাহির হয়, যাহা ক্ষমতায় থাকিবার সময় তাহারা কল্পনাও করিতে পারেন না। উন্নয়নশীল বিশ্বে এই সমস্যাটা আরো প্রকট। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এইভাবে চলিতে পারে না। যেহেতু এইভাবে চলিতে পারে না, তাই, আপাতভাবে কোনো কিছু না হওয়াটাই ইঙ্গিত দেয়—কিছু একটা হইবে। চশমা পরিষ্কার করিয়া দেখা উচিত—ঈশান কোণে কি মেঘ জমিতেছে না?
আমরাও স্বাধীনতার ৫০ বত্সর পার করিবার পর দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলিতে পারি, আমাদের ৩০ লক্ষ শহিদের রক্ত বৃথা যাইতে পারে না। এই রক্তের প্রতিটি ফোঁটার মূল্য আমাদের উত্তরসূরিরা কড়ায় গন্ডায় বুঝিয়া লইবে নিশ্চয়ই। আমরা যদি বিশ্বের এই ধরনের ত্যাগের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি ফেলি, দেখিতে পাইব—সেইখানে কোথাও এই ত্যাগ বৃথা যায় নাই। প্রতিটি পরিস্থিতি হইতেই আমাদের শিখিবার অনেক কিছু রহিয়াছে। আমরা যেন ইহা ভুলিয়া না যাই।