সামরিক জান্তার শেষ রক্ষা হবে কি?

সঠিক ও যোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাবে একটা সম্ভাবনাময় দেশ কীভাবে নিঃশেষ হয়ে যায়, তার জ্বলন্ত উদাহরণ এখন মিয়ানমার। ১৯৬২ থেকে ২০২১ এই ৫৯ বছর সামরিক শাসক ও সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে মিয়ানমার পরিচালিত হচ্ছে, যদিও ২০১১ থেকে ২০১৫ এবং ২০১৬ থেকে ২০২০—এই দুই মেয়াদে বাহ্যিকভাবে দুটি বেসামরিক সরকার ছিল। কিন্তু কার্যত সব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিল সেনাবাহিনীর হাতে। এত দীর্ঘ সময় ধরে সেনাবাহিনীর শাসন ও কর্তৃত্বের রেকর্ড বিশ্বের আর কোনো দেশে নেই। মিয়ানমারের প্রায় ৬ কোটি মানুষের অর্ধেকের বেশি এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, যা এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের থেকে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সেই ১৯৬২ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র অফিসার—সবার রয়েছে বড় বড় ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান এবং তারা প্রত্যেকেই বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদের মালিক। এ কারণেই তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কিছুতেই ছাড়তে চাইছে না। মিয়ানমারের স্বাধীনতাসংগ্রামের ক্যারেশমেটিক জনপ্রিয় লিডার অং সানের মেয়ে সু চি ১৯৮৮ সালে প্রবাসজীবন ত্যাগ করে রাজনীতিতে পদার্পণের ফলে মূলত পিতার লিগাসি বা উত্তরাধিকার সূত্রে বৃহত্তর মানুষের মধ্যে নতুনভাবে আশার সঞ্চার হয়, তারা সু চির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৯৯০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নবগঠিত রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সু চির নেতৃত্বে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী হয়। ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীর জন্য অশনিসংকেত বেজে ওঠে। নির্বাচনের ফল বাতিল এবং সু চিকে বন্দি করে সেনাবাহিনী। এই সময়ে চীনের অপ্রতিরোধ্য উত্থানের আভাস সর্বত্র। আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ব নতুন করে হিসাব কষে। তাতে তখন পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় থিংকট্যাংক মনে করে, আগামী দুই থেকে তিন দশকের মধ্যে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার সব স্বার্থ চীনের পক্ষ থেকে ভয়ানক হুমকির মধ্যে পড়বে। সুতরাং চীনকে আটকানোর দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়নে থিংকট্যাংকগুলো মনে করে, মিয়ানমার যদি পরিপূর্ণভাবে পশ্চিমা বিশ্বের কবজায় থাকে, তাহলে স্ট্র্যাটেজিক্যালি চীনকে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রাখা যাবে।

বিশাল জনপ্রিয়তায় পশ্চিমা বিশ্বের মনে হয়, সামরিক জান্তা বেশি দিন সু চিকে আটকে রাখতে পারবে না। অচিরেই সু চি হবে মিয়ানমারের সর্বেসর্বা। সুতরাং আগাম বুকিং শান্তির পক্ষে কোনো অবদান রাখার আগেই ১৯৯১ সালে সু চি নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়ে যান। ফল হয় হিতে বিপরীত। এখন এই সময়ে এসে বিচার করলে বোঝা যায়,  সু চিকে পশ্চিমা বিশ্বের এই আগাম বুকিং সবচেয়ে বড় ব্লান্ডার বা মহাভুল পদক্ষেপ হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও চীনের পক্ষে আমেরিকার উদ্দেশ্য ও কৌশল বুঝতে অসুবিধা হয় না। একসময়ে গত শতকের ষাট  ও সত্তরের দশকে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে আমেরিকা সামরিক শাসকদের ক্ষমতায় আনার ব্যাপারে সহায়তা এবং পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। সেটা ছিল তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঠান্ডা যুদ্ধের কৌশলের অংশ। কিন্তু দেখা গেছে, গণ-আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানে সামরিক শাসকদের অবস্থা পড়িপড়ি এবং তার স্ট্র্যাটেজিক আবশ্যকতা ফুরিয়ে গেলে আমেরিকা ঐ সামরিক শাসকের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের ব্যবস্থায় দীর্ঘ মেয়াদে সামরিক শাসকদের নির্ভরশীল মুরব্বি হিসেবে আমেরিকা পরিপূর্ণ বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি।

নতুন স্নায়ুযুদ্ধের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন-আমেরিকা এখন মুখোমুখি। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। মুরব্বিয়ানা ক্ষমতায় আমেরিকা এখনো এক নম্বর হলেও দূরের ও কাছের মুরব্বির মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা ও চাপে দীর্ঘ মেয়াদে সামরিক শাসকদের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত রাখার যে সীমাবদ্ধতা আমেরিকার রয়েছে চীনের সেটা নেই। সুতরাং সব হিসাবনিকাশ করেই মিয়ানমারের সামরিক শাসকগণ চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। আর স্ট্র্যাটেজিক আত্মরক্ষার অপরিহার্যতায় মিয়ানমারের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রভাব প্রতিষ্ঠা এবং তা অব্যাহত রাখার বিকল্প কোনো রাস্তা চীনের হাতে নেই। কারণ সামরিক সংঘাত বাধলে মালাক্কা প্রণালি চীনের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা ও ক্ষমতা আমেরিকার রয়েছে। সেক্ষেত্রে চীনের রক্ষাকবচ জ্বালানি সরবরাহের পথ ভারত মহাসাগরের ওপর দিয়ে চলাচলের জন্য প্রবেশ ও বাহিরের একমাত্র বিকল্প রাস্তা মিয়ানমারের সমুদ্রবন্দর। সুতরাং মিয়ানমারের ওপর একচ্ছত্র প্রভাব স্থাপন করা-না-করার মধ্যে চীনের অস্তিত্ব নির্ভরশীল। তাই পরস্পরের সুবিধার জন্যই মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্ভরশীল মুরব্বি এখন চীন। এ কারণেই গণতন্ত্রের নেত্রী অং সান সু চিকে হিরো থেকে জিরো বানাবার কৌশলে সামরিক জান্তা প্রণয়ন করে ২০০৮ সালের সংবিধান। তাতে যে বেসামরিক সরকারই আসুক না কেন, তাকে সেনাবাহিনীর ওপর পরিপূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবে। ২০১৫ সালের নির্বাচনে জিতে সেই কৌশলের পাতা ফাঁদে পা দেন সু চি। সবকিছু মেনে নিয়ে আপসের মাধ্যমে ২০১৬ সালে সরকার গঠন করেন। বিশ্বের সব দেশে যেখানেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব সামরিক শাসকদের সঙ্গে আপসের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়েছে এবং যাওয়ার চেষ্টা করেছে সেসব রাজনীতিবিদের সবাই নিজের অস্তিত্বকে হারিয়েছে।  হাতের পুতুলের মতো ইচ্ছামাফিক পাঁচ বছর সু চিকে সেনাবাহিনী ব্যবহার করেছে। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর শুধু সমর্থন নয়, ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে নিজে উকিল হিসেবে দাঁড়িয়ে বলেছেন, রাখাইন রাজ্যে তেমন কিছু হয়নি, সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ নির্দোষ। সামরিক জান্তা এটাই চায়। সব অপকর্ম করবে তারা, দায় নেবে সু চি ও তার সরকার। পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী, দায় কিছু নেই। সামরিক জান্তা এভাবেই চলতে চেয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সু চির দল আগের চেয়েও বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে। ধারণা করা হয়, সু চি এবার পুতুল সরকারের ভূমিকা পালনে অসম্মতি প্রদানের কারণেই পহেলা ফ্রেরুয়ারিতে নতুন করে সামরিক শাসন ও সরাসরি কর্তৃত্ব নিয়েছে সাময়িক জান্তা। এর বিরুদ্ধে বিগত প্রায় আড়াই মাস ধরে দেশব্যাপী বিক্ষোভ-প্রতিবাদ, আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৬০০ বিক্ষোভকারী টহলরত সেনাদের গুলিতে নিহত হয়েছে। আগেও বহুবার সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে এবং এরকম হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু একসময়ে সব ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে।

এই লেখাটি যখন শেষ করছি তখন খবরে দেখলাম, ১০ এপ্রিল বিক্ষোভকারীদের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলেছে সেনাসদস্যরা এবং গুলিতে ৬০ জন আন্দোলনকারী নিহত হয়েছে। তাতে মনে হচ্ছে, সামরিক বাহিনী কোনো ছাড় দেবে না। তবে এবারের প্রতিবাদে কিছুটা ভিন্ন মাত্রা আছে। রাষ্ট্রের বেসামরিক প্রশাসনের কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে। সামরিক বাহিনীর কয়েক জন জুনিয়র অফিসার পক্ষ ত্যাগ করেছে। বিদেশে দুই-তিন জন রাষ্ট্রদূত সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গিয়ে পদত্যাগ করেছে। অভ্যন্তরে কারেন, কাচিন, শানসহ ডজনখানেক সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপ প্রথমবারের মতো বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে, যদিও জাতিগতভাবে বার্মিজদের প্রবল প্রাধান্য থাকা সু চির দল এনএলডির সঙ্গে এসব ভিন্ন জাতিসত্তার বিদ্রোহীদের সদ্ভাব কখনোই ছিল না। এই ফ্যাক্টরগুলো অবশ্যই সাময়িক জান্তার চিন্তাভাবনার ওপর প্রভাব ফেলবে। কিন্তু জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে কার্যকরী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ চীন-রাশিয়া তার বিরুদ্ধে প্রবল শক্তি নিয়ে ভেটো প্রয়োগ করবে।

সামরিক বাহিনীসহ মিয়ানমারে যারাই ক্ষমতায় থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে যায়—এমন কোনো পদক্ষেপ এ অঞ্চলের অন্যতম বড় দেশ ভারত কখনো নেবে না। কারণ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ভারতের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ রয়েছে। আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ব সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে অনেক হাঁকডাক ছাড়ছে। কিন্তু ছিটেফোঁটা ব্যতীত বড় ধরনের সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা এখনো প্রয়োগ করেনি। মনে হয়, মিয়ানমারের সঙ্গে তারাও সব দরজা বন্ধ করতে চায় না। আঞ্চলিক অন্য বড় শক্তি জাপান-অস্ট্রেলিয়া মৃদুস্বরে গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বললেও নিজস্ব ব্যাবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে তাড়িঘড়ি কোনো পদক্ষেপ নেবে বলে মনে হয় না। ১০ সদস্যের আসিয়ান সংস্থা, যেখানে মিয়ানমারও সদস্য, সংঘের নীতিমালার সীমাবদ্ধতায় অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সম্মিলিত বড় পদক্ষেপ নিতে পারবে না। সুতরাং এটা মোটামুটি স্পষ্ট, আন্তর্জাতিক চাপে সামরিক জান্তাকে মাথা নোয়াতে হবে না। এমতাবস্থায় দুইভাবে সামরিক কর্তৃত্বের কবল থেকে মিয়ানমার মুক্ত হতে পারে। প্রথমত, সামরিক বাহিনীর ভেতরে একটা মোটামুটি বড় গ্রুপ রয়েছে, যারা বর্তমান সেনাপ্রধান অং মিন হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে এবং সাবেক সেনাশাসক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট থিন সিনের অনুসারী। এই পক্ষ পালটা ক্যু ঘটাতে পারলে অন্যরকম কিছু হতে পারে। দ্বিতীয়ত চলমান বিক্ষোভ-প্রতিবাদ যদি আরো তীব্র হয় এবং তা দীর্ঘ মেয়াদে অব্যাহত থাকে, তাহলে সামরিক বাহিনী একটা আপসরফায় যেতে পারে। উল্লিখিত দুটি পথের কোনোটাই নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী নয়। সুতরাং ৫৯ বছর ধরে সামরিক জান্তার কর্তৃত্ব আরো দীর্ঘদিন মিয়ানমারে অব্যাহত থাকলে তাতে অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকবে না।

n লেখক :গবেষক এবং রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

ইমেইল :sikther52@gmail.com