দূর হোক পথের কাঁটা

 ‘পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’ একজন নারী কিংবা মা একটি পরিবারের কেন্দ্রীয় চরিত্র, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভালো-মন্দের অদ্বিতীয় অংশীদার। সমাজের এই অত্যাবশ্যকীয় অর্ধাংশকে অন্ধকারে রেখে একটি সমাজ তথা রাষ্ট্রের উন্নতি কখনোই সম্ভব নয়। আগামীর ভবিষ্যত্ এই জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে নারীর প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে নিশ্চিত করতে হবে নারীর সুষম অধিকার এবং জীবনমানের পর্যাপ্ত মূল্যায়ন।

নারীর ক্ষমতায়ন এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নারী তার পূর্বের অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে নিজের যোগ্যতা, সিদ্ধান্ত, সৃজনশীলতা ও অর্জনকে সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরতে পারে। নারীর ক্ষমতায়ন সমাজের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার জীবন ও নিজস্ব মূল্যবোধকে বিকশিত করতে সাহায্য করে। তবে নারীর ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়াই শিক্ষা, কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনধারায় পরিবর্তন আনার জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাগুলো ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ পায়। নারীর ক্ষমতায়নই আগামী দিনে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ও সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম চাবিকাঠি।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসেও নারী-পুরুষের সমতা, স্বাধীনতা, অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিয়ে সর্বত্র ভুলে ভরা এক ধারণা লালন করে চলেছি আমরা। এ ক্ষেত্রে ইচ্ছাশক্তির অভাবের পাশাপাশি রয়েছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা এবং এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অভাব। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে একটি বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে চেয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর তাঁর প্রণীত বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৭, ১৯, ২৮, ২৯-সহ বিভিন্ন ধারায় নারীর শিক্ষা, চাকরি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির বাধ্যবাধকতা থাকলেও স্বাধীনতার ৫০ বছরেও নারীর ক্ষমতায়নে বঙ্গবন্ধুর এই মনোভাব সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই সময়ে বিভিন্ন সংগঠনের জরিপে প্রতিনিয়ত উঠে এসেছে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন এবং নারীর প্রতি সহিংসতার অসংখ্য ভয়াবহ চিত্র। স্বপ্নের বাংলাদেশ পুনর্গঠনের এই বাস্তব প্রতিফলন বঙ্গবন্ধু হয়তো স্বচক্ষে দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বঙ্গবন্ধুকন্যা, দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী অধিকার সুপ্রতিষ্ঠায় পুরোদমে কাজ করে যাচ্ছে।

শিক্ষায় নারীর শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিকভাবে নারীকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টি, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীর সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং রাজনীতিতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণকে উত্সাহিত করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনার গৃহীত উদ্যোগ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১৭-১৮ সালের অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের ২৮ শতাংশ নারী উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল, ২০১৮-১৯ সালে তা ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর হার ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ। সরকার ৬ থেকে ১০ বছর বয়সি সব শিশুকে বিনা মূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েরা পড়াশোনা করতে পারছে বিনা মূল্যে। মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চলছে বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং পড়াশোনায় মেয়েদের উত্সাহিত করতে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি অসংখ্য বৃত্তিব্যবস্থা।

এছাড়া নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা এসএমই ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আবার নারী উদ্যোক্তারা বাংলাদেশ ব্যাংক ও এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ১০ শতাংশ সুদে ঋণও নিতে পারছেন। বর্তমানে ৩০ লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক পোশাকশিল্পে কর্মরত আছেন। সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১৬ থেকে ২০২০) অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতের অঙ্গীকার করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, সেনা, নৌ, পুলিশ, বিজিবি, সাহিত্য, শিল্পসহ সর্বোচ্চ বিচারিক কাজেও নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সাফল্য এখন লক্ষণীয়। আমাদের নারীরা খেলাধুলায়ও পিছিয়ে নেই।

সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমান অংশীদার নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পারিবারিক পরিমণ্ডলে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে নারীকে পরিপূর্ণভাবে স্বাবলম্বী করা বা সামাজিক ও গণজীবনে নারীর শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করা যায়।

নারী তার মেধা, শ্রম, সাহসিকতা, শিক্ষা ও নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের দেশ গঠনে হাতে হাতে কাজ করে যাচ্ছে এবং একই সঙ্গে ভূমিকা রাখছে একটি স্বাবলম্বী শিক্ষিত প্রজন্ম গঠনে। নানা অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে যে অভাবনীয় আর্থিক সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে, তা মূলত নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির জন্যই। নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে বঙ্গবন্ধুকন্যার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি গ্লোবাল উইমেন্স লিডারশিপ, প্ল্যানেট ফিফটি ফিফটি চ্যাম্পিয়ন, এজেন্ট অব চেঞ্জসহ নানাবিধ সম্মাননা অর্জন করেছেন। তাঁর সব অর্জন আমাদের গর্বিত করে, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বৈষম্যহীন-সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করে দেশের সব কল্যাণজনক কাজে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ  আগামী দিনে আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রত্যাশা থাকবে, নারীর জন্য  বাংলাদেশ হয়ে উঠুক নিরাপদ এবং উপযুক্ত বিচরণক্ষেত্র।

n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়