কমেছে এলপি গ্যাসের দাম

দেশে প্রথমবারের মতো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) দাম রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারণ করা হলো। আর তাতেই প্রথমবারের মতো সারা দেশে অভিন্ন দামে বিক্রি হবে রান্না ও পরিবহন খাতে নিত্য ব্যবহূত এ জ্বালানি। বিদ্যমান দামের চেয়েও কমেছে প্রতি সিলিন্ডার এলপিজির দাম। রান্নার কাজে ব্যবহূত ১২ কেজির এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের খুচরা দাম ৭৫ থেকে ২২৫ টাকা পর্যন্ত কমেছে। বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ১২ কেজির এ সিলিন্ডার গ্যাস মূসকসহ সর্বোচ্চ ৯৭৫ টাকায় পাওয়া যাবে। আর সরকারি কোম্পানির সাড়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৫৯১ টাকা। গতকাল সোমবার থেকে এ মূল্যহার কার্যকর ঘোষণা করা হয়েছে।

গতকাল এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এলপিজির মূল্যহার ঘোষণা করে এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এ মূল্যহার অনুসরণ করা সব শ্রেণির ব্যবসায়ীদের জন্য বাধ্যতামূলক। ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে নতুন মূল্য প্রদর্শন করতে হবে। ঘোষিত মূল্যহার অনুযায়ী, রান্নার গ্যাস বেসরকারি এলপিজির প্রতি কেজির দাম ভ্যাটসহ ৮১ টাকা ৩০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। গাড়িতে ব্যবহূত অটোগ্যাস প্রতি লিটারের খুচরা দাম ৪৭ টাকা ৯২ পয়সা।

দেশে বর্তমানে বছরে ১০ লাখ মেট্রিক টন এলপিজি ব্যবহূত হচ্ছে। আমদানিনির্ভর পণ্যটির চাহিদার সিংহভাগ- প্রায় ৯ লাখ ৮৫ হাজার টন সরবরাহ করছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড বাকি প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার টন এলপিজি বাজারজাত করছে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ২৮টি বেসরকারি কোম্পানির মধ্যে ২০টি এলপিজি আমদানি করছে।

এত দিন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় জেলায় ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির এলপিজি ভিন্ন ভিন্ন খুচরা দামে বিক্রি হতো। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ১২ কেজির সিলিন্ডার গ্যাস। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কোথাও প্রতি সিলিন্ডারের দাম ছিল এক হাজার ৫০ টাকা। কোথাও কোথাও এর দাম ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছিল।

দেশে বিভিন্ন কোম্পানির ১৩টি ভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যায়। বিইআরসির ঘোষিত মূল্যহার অনুযায়ী সাড়ে ৫ কেজির সিলিন্ডারের খুচরা দাম ৪৪৭ টাকা, ১২ কেজির প্রতিটি ৯৭৫ টাকা, সাড়ে ১২ কেজির প্রতিটি ১ হাজার ১৭ টাকা, ১৫ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ২২০ টাকা, ১৬ কেজির প্রতিটি ১ হাজার ৩০১ টাকা, ১৮ কেজির প্রতিটি ১ হাজার ৪৬৪ টাকা। ২০ কেজি সিলিন্ডার প্রতিটি ১ হাজার ৬২৭ টাকা; ২২ ও ২৫ কেজির সিলিন্ডার প্রতিটির দাম যথাক্রমে ১ হাজার ৭৮৯ ও ২ হাজার ৩২ টাকা; ৩০ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৪৪০ টাকা; ৩৩ ও ৩৫ কেজির প্রতিটির দাম যথাক্রমে ২ হাজার ৬৮৩ টাকা ও ২ হাজার ৮৪৬ টাকা এবং ৪৫ কেজি সিলিন্ডার প্রতিটির দাম ৩ হাজার ৬৫৯ টাকা।

বিইআরসি জানায়, এলপিজি আমদানি থেকে শুরু করে গ্রাহক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত নানা খরচ বিবেচনায় এলপিজির খুচরা মূল্যহার নির্ধারণ করা করা হয়েছে। দেশের সাধারণত সৌদি আরবের কোম্পানি সৌদি আরামকো থেকে এলপিজির প্রধান উপাদান বিউটেন ও প্রোপেন আমদানি করা হয়। আরামকো থেকে কেনা মূল্যের সঙ্গে জাহাজ ভাড়া, ট্রেডারের প্রিমিয়াম চার্জ, ইমপোর্ট প্যারিটি চার্জ, মজুতকরণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ, মূল্য সংযোজন কর, ডিস্ট্রিবিউটর চার্জ, রিটেইলার চার্জসহ বিভিন্ন চার্জ বিবেচনায় নিয়ে এ খুচরা মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে।

দেশে গ্যাস সংকট বাড়তে থাকায় এলপিজির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু এর দাম নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণে রাষ্ট্র বা সরকারের ভূমিকা ছিল না দীর্ঘকাল। অথচ আইন অনুযায়ী দেশে এলপিজির দাম নির্ধারণের এখতিয়ার শুধু বিইআরসির। এমন বাস্তবতায় এলপিজির দাম বিইআরসির মাধ্যমে নির্ধারণের জন্য ২০১৬ সালে আদালতে রিট আবেদন করে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ঐ আবেদনের সঙ্গে ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারিতে ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘এলপি গ্যাস নিয়ে নৈরাজ্য’ শীর্ষক প্রধান শিরোনামের প্রতিবেদনটিও সংযুক্ত করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে মামলাটি চলমান থাকার পর গত বছর গণশুনানির মাধ্যমে মূল্যহার নির্ধারণের জন্য বিইআরসিকে নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত। আদালতের রায় মেনে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি এ বিষয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে ভোক্তা অধিকার কর্মী, সরকারি কর্মকর্তা এবং বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা অংশগ্রহণ করেন। সে ধারাবাহিকতায় গতকাল এলপিজির মূল্যহার ঘোষণা এবং এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করল এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।

সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসির চেয়ারম্যান মো. আবদুল জলিল বলেন, গণশুনানি শেষে সবকিছু বিচার-বিবেচনা ও দাখিল করা তথ্য যাচাই-বাছাই করে একাধিক সভার মাধ্যমে কমিশন দাম চূড়ান্ত করেছে। এই দাম আজ (সোমবার) থেকে কার্যকর হবে। পরবর্তী আদেশ না হওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকবে। এক প্রশ্নের উত্তরে বিইআরসির চেয়ারম্যান মো. আবদুল জলিল বলেন, সারা দেশে এলপি গ্যাসের দাম অভিন্ন থাকবে। ভোক্তারা বাড়তি দাম দেবেন না। কমিশনের আদেশ বাস্তবায়ন করতে লাইসেন্সধারীরা বাধ্য। তা না হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিইআরসির সদস্য মোহম্মদ আবু ফারুক, মকবুল-ই-ইলাহি চৌধুরী, ও মোহাম্মদ বজলুর রহমান।

এদিকে গত বছরের ডিসেম্বরে বিইআরসিতে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করে এলপিজি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো। গণশুনানির আগে তাদের প্রস্তাব মূল্যায়ন করে বিইআরসি গঠিত কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। তারপর গণশুনানিতে এলপিজি সরবরাহকারী কোম্পানির প্রস্তাব ও কারিগরি কমিটির মূল্যায়ন নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। গৃহস্থালি রান্নার কাজে ব্যবহূত এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৯ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলো। আর সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিল সরকারি কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেড (এলপিজিএল)। সম্প্রতি এলপিজি আমদানিতে আগের ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে তা ৭ শতাংশে নামিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন মূল্যহার নির্ধারণ বা দাম কমানোর ক্ষেত্রে তার বড় ভূমিকা রয়েছে।