পবিত্র মাহে রমজান ও উদ্ভূত পরিস্থিতি

আজ হইতে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ পবিত্র মাহে রমজানের মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা শুরু করিয়াছেন। গত বত্সরের মতো এইবারও বিশ্বব্যাপী অব্যাহত থাকা কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যে রোজা পালন করিতে হইতেছে। গত বত্সরের তুলনায় এইবার বরং পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ ও প্রতিকূল। কঠোর বিধিনিষেধের কারণে মাহে রমজানের সাধারণ দৃশ্যপটের পরিবর্তন হইয়াছে বটে, তবে ইহা ধর্মভীরু মানুষের জন্য কিছু সুযোগও তৈরি করিয়াছে। বিশেষ করিয়া এই সময়ে অধিকাংশ অফিস-আদালত বন্ধ থাকায় এবং বাহিরে চলাফিরার অবকাশ না থাকায় বা সীমিত থাকায় ঘরে বসিয়া একান্তভাবে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিনের ইবাদত-বন্দেগিতে অধিক মনোযোগ দেওয়ার অবারিত সময় আসিয়াছে। সেহরি ও ইফতারের আনুষ্ঠানিকতা না থাকায় প্রতিবেশী অসহায়, গরিব-দুঃখী ও বুভুক্ষু মানুষকে বেশি করিয়া দান-খয়রাত করিয়া অফুরন্ত সওয়াব হাসিলের সুবর্ণ সুযোগও সৃষ্টি হইয়াছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে আমরা মাহে রমজানকে স্বাগত জানাই। আহলান সাহলান ইয়া মাহে রামাদান।

আরবি রমজান শব্দের অর্থ হইল দহন। মানুষের জৈবিকতা ও পাশবিকতা দহন করিয়া থাকে রোজা। দহন প্রক্রিয়ায় স্বর্ণ যেমন খাদমুক্ত হয়, তেমনি সিয়ামের দহনে মানুষ খাঁটি মানুষে পরিণত হয়। ধৈর্য, আত্মসংযম, কুপ্রবৃত্তি ও পাপ-পঙ্কিলতা হইতে মুক্তির মাধ্যমে একজন রোজাদার এক মাসের প্রশিক্ষণ শেষে মুত্তাকি বা পরহেজগার ও নিষ্পাপ ব্যক্তির রূপ লাভ করিয়া থাকেন। সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে সিয়াম পালনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সেই কথাই বলা হইয়াছে। শুধু চারিত্রিক দিক দিয়া নহে, শারীরিক দিক হইতেও রোজাদারগণ লাভবান হইয়া থাকেন। রোজা দেহের জন্য কাজ করে প্রতিষেধক হিসাবে। সারা বত্সর আমাদের দেহে যে টক্সিন বা জৈব রসজাত বিষ জমা হয়, তাহা রোজা দহন করিয়া ফেলে। এই জন্য সময়সীমা, মাস ও সংখ্যা নিয়া তারতম্য থাকিলেও যুগে যুগে প্রত্যেক নবি-রসুলের উম্মতের মধ্যে রোজা পালনের দৃষ্টান্ত খুঁজিয়া পাওয়া যায়। এমনকি বিভিন্ন ধর্মেও কোনো না কোনো ফরমে ইহার বাস্তব নজির দেখা যায়। আদি পিতা হজরত আদম (আ.) হইতে শুরু করিয়া শেষ নবি হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর আগ পর্যন্ত প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখার প্রচলন ছিল। হজরত মুসা (আ.)-এর আমল হইতে আশুরার রোজা পালন শুরু হয়। তবে দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে রসুলুল্লাহ (স.)-এর ওপর রমজান মাসের রোজা ফরজ হইবার পর পূর্ববর্তী নবি ও রসুলদের জামানার যে রোজার বিধান ছিল, তাহার ফরজিয়াত রহিত হইয়া যায়। এইগুলি পরে সুন্নতি আমলে পরিণত হয়, যাহা এখনো কার্যকর রহিয়াছে।

ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর মতে, শুধু পানাহার ও স্ত্রীমিলন হইতে বিরত থাকাই নহে, বরং শ্রবণ, দৃষ্টি ও বাকশক্তি এবং হস্তপদসহ সমগ্র অঙ্গপ্রতঙ্গের পাপাচার হইতে বিরত থাকাই উত্তম রোজা। কেননা, রোজার আরবি শব্দ ‘সাওম’ অর্থই হইল ‘বিরত থাকা’, অর্থাত্ সকল প্রকার অন্যায়-অনাচার ও পাপকর্ম হইতে বিরত থাকা। এই পবিত্র মাসে ও লকডাউন পরিস্থিতিতে আমাদের প্রধান করণীয় হইল—মুখ ও জিহ্বাকে সংযত রাখা, দিনি বিষয়ে ঘরোয়া তালিম করা, তাহাজ্জুতসহ বেশি বেশি নফল নামাজ আদায় করা এবং কোরআন তেলাওয়াত করা, অন্যকে ইফতার করানো, ইতেকাফ করা, বেশি বেশি জিকির ও তাসবিহ-তাহলিল করা, সঠিকভাবে লাইলাতুল কদর পালন করা, করোনা মহামারির কারণে ঈদের কেনাকাটা যথাসম্ভব কমাইয়া দরিদ্রদের জন্য দান-খয়রাতের হস্ত সম্প্রসারণ করা, যথানিয়মে জাকাত ও ফিতরা প্রদান করা ইত্যাদি। পক্ষান্তরে মিথ্যা, অশ্লীল কথা ও অসত্ কাজ হইতে বিরত থাকা এবং সগিরা বা কবিরাসহ যে কোনো গুনাহ হইতে আমাদের সতর্ক থাকিতে হইবে।