(পূর্ব প্রকাশের পর)
৪ নম্বর মাসায়েল—যেসব কারণে রোযা মাকরুহ হয় : (১) রোযা অবস্থায় দিনের বেলায় অপ্রয়োজনে কোনো বস্তু চিবানো অথবা লবণ ইত্যাদি জিহ্বায় দিয়ে থুতু ফেলে দেওয়া; টুথপেস্ট বা মাজন বা কয়লা দ্বারা দাঁত মাজা বা পরিষ্কার করা। (২) গোসল ফরয হলেও সারা দিন অপবিত্র অবস্থায় কাটিয়ে দেওয়া। (৩) একান্ত প্রয়োজন ছাড়া সিংগা লাগানো এবং দুর্বল হয়ে পড়ার ভয় থাকলে নিজ শরীর থেকে অন্যের জন্য রক্তদান করা মাকরুহ; কিন্তু তাতে রোযা নষ্ট হয় না। (৪) রোযা অবস্থায় গিবত করা তথা কারো অবর্তমানে তার দোষ বর্ণনা করা রোযার ক্ষেত্রে মাকরুহ বটে; কিন্তু এ গিবত কর্মটি অন্যতম একটি হারাম কাজ ও কবিরা গুনাহ। মাহে রামাদানে এর পাপ আরো অনেক গুণ বেড়ে যায়। (৫) রোযা অবস্থায় ঝগড়া-বিবাদ, গালিগালাজ করা; হোক তা কোন মানুষের সঙ্গে বা কোনো জীবজন্তুকে বা কোনো প্রাণহীন জড় বস্তুকে; এসব কারণেও রোযা মাকরুহ হয়ে যায়।
৫ নম্বর মাসায়েল—যেসব কারণে রোযা নষ্টও হয় না, মাকরুহও হয় না :(১) মিসওয়াক করা। (২) মাথায় বা মোচ-দাড়িতে তেল ব্যবহার করা। (৩) চোখে ওষুধ বা সুরমা দেওয়া। (৪) আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা। (৫) গরম ও পিপাসার কারণে গোসল করা। (৬) যে কোনো রকম ইনজেকশন বা টিকা দেওয়া। (৭) ভুলবশত পানাহার করা। (৮) অনিচ্ছাবশত গলায় ধোঁয়া বা ধুলোবালি বা মাছি ইত্যাদি প্রবেশ করা। (৯) কানে পানি দেওয়া (২/১ ফোঁটা) অথবা অনিচ্ছাকৃত প্রবেশ করা। (১০) অনিচ্ছাকৃত বমি হওয়া। (১১) শোয়া অবস্থায় স্বপ্নদোষ হয়ে যাওয়া। (১২) দাঁত থেকে রক্ত বের হওয়া এবং তা গলা অতিক্রম না করা। (১৩) ঘুমের মধ্যে বা স্ত্রীমিলনের কারণে রাতে গোসল ফরয হয়েছিল; অথচ সুবহে সাদেকের পূর্বে গোসল করা হয়নি; আর এমতাবস্থায় রোযার নিয়ত করে নেওয়া হয়েছে; তাতেও রোযার কোনো ক্ষতি নেই।
৬। যেসব কারণে রামাদানে রোযা না রাখার অনুমতি আছে :(১) রোগের কারণে রোযা পালনের শক্তি না থাকলে, অথবা রোগ বেড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা হলে রোযা না রাখা জায়েয; তবে পরবর্তী সময়ে কাযা করা জরুরি হবে। (২) যে নারী গর্ভধারণ অবস্থায় আছে এবং রোযা রাখতে গেলে গর্ভস্থিত শিশুর বা নিজের প্রাণের ক্ষতির প্রবল আশঙ্কা থাকে; সেক্ষেত্রে রোযা না রেখে পরবর্তী সময়ে কাযা করে নিতে পারবে। (৩) যে নারী নিজের বা অন্য কারো শিশুকে দুধ পান করায়; এমতাবস্থায় যদি রোযার কারণে শিশু দুধ না পায়, কষ্ট হয়; তাহলে সেক্ষেত্রে রোযা না রেখে পরে কাযা করে নিবে। (৪) শরীয়তসম্মত মুসাফির যিনি নূন্যতম ৮৮ (সাতাশি কিলোমিটার, সাত শত বিরাশি মিটার ও চল্লিশ সেন্টিমিটার সমপরিমাণ : সূত্র : জাদিদ ফিকহি মাসায়েল : খ-১, পৃ. ১৪২) কিলোমিটার দূরত্ব সফরের নিয়তে বের হবেন তার জন্যও রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে। তার পরও, সফর যদি কষ্টের না হয় তাহলে সেক্ষেত্রে রোযা রাখাই তার জন্য উত্তম। কিন্তু যেক্ষেত্রে নিজের বা সফরসঙ্গীদের কষ্ট হতে পারে, সেক্ষেত্রে রোযা না রাখাই উত্তম। (৫) রোযা রেখে সফর শুরু করলে, সেক্ষেত্রে রোযাটি পূর্ণ করাই জরুরি। সফররত অবস্থায় পানাহার করে দিনের বেলায় বাড়িতে বা নিজ ঠিকানায় পৌঁছলে, দিনের অবশিষ্ট সময় পানাহার না করাই সমীচীন। যদি এমন হয় যে, এখনো কোনো কিছু পানাহার করা হয়নি; আর এমতাবস্থায় বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করা হয়েছে যে, তখনো রোযার নিয়তের সময় বাকি থাকে; সেক্ষেত্রে তার জন্য রোযার নিয়ত করে নেওয়া জরুরি। (৬) কাউকে যদি হত্যা করার হুমকি দিয়ে রোযা ভাঙতে বাধ্য করা হয়; তার পক্ষে রোযা ভেঙে ফেলা জায়েয ; তবে পরে তা কাযা করে নেবে। (৭) কোনো রোগের কারণে বা ক্ষুিপপাসার প্রাধান্য যদি এমন পর্যায়ের হয় যে, একজন বিজ্ঞ ও ধার্মিক মুসলমান চিকিত্সকের মতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রাণের আশঙ্কা দেখা দেয়; সেক্ষেত্রে রোযা ভেঙে ফেলা জায়েয ; এমনকি জরুরিও বটে। অবশ্য পরে তা কাযা করে নেবে। (৮) নারীদের জন্য মাসিক ঋতুস্রাব চলাকালীন এবং সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রসূতি অবস্থায় রোযা রাখা জায়েয নয়; পরবর্তী সময়ে তা কাযা করে নিতে হবে। রোগী, মুসাফির, হায়েয ও নেফাসগ্রস্ত নারী, যাদের জন্য রামাদানে রোযা না রাখা ও পানাহার করা জায়েয; তাদের পক্ষেও মাহে রামাদানের সম্মান বজায় রাখা আবশ্যক। যে কারণে তারাও প্রকাশ্যে সবার সামনে পানাহার করতে যাবেন না।
৭। রোযার কাযা : (১) কোনো ওযরবশত রোযা কাযা হয়ে গেলে, যখন ওযর দফা হয়ে যায় তখন আর বিলম্ব না করে ঐ রোযা কাযা করে নেওয়া চাই। জীবনের যেমন কোনো ভরসা নেই, তেমনি শক্তি-সামর্থ্য ও সুস্থতারও কোনো বিশ্বাস নেই। কাযা রোযার ক্ষেত্রে যেমন একাধারে তা পালনের এখতিয়ার থাকে, তেমনি দু-একটি করে পৃথক পৃথকও রাখার এক্তিয়ার আছে। (২) মুসাফির সফর থেকে ফিরে আসার পর অথবা অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার পর যদি এটুকু সময় না পায়, যাতে কাযা রোযাগুলো আদায় করতে পারে; সেক্ষেত্রে ঐ রোযার কাযা তার ওপর আবশ্যক হয় না। অর্থাত্ ফিদিয়া আদায় জরুরি হয় না। তবে সফর থেকে ফিরে আসার পর অথবা সুস্থ হওয়ার পর যে কয়দিন সুযোগ পেয়েছিলেন অথচ কাযা আদায় করেননি, সে কয়দিনের কাযা তার ওপর আবশ্যক হিসেবে বর্তাবে এবং ইতোমধ্যে মারা গেলে ঐ কয়দিনের ফিদিয়াও তার ওপর আবশ্যক হবে। (চলবে)
lলেখক :মুফতী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা