মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কতটা ভাবি?

জাপান উন্নত একটি রাষ্ট্র, যেখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিটি মানুষের গড় আয় আমাদের মাথাপিছু আয়ের চাইতে কয়েক গুণ বেশি। অথচ খুবই উদ্বিগ্নতার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের দেশের আত্মহত্যার সংখ্যা। সর্বোচ্চ আত্মহত্যার হারের দেশগুলোর একটি হচ্ছে জাপান। কল্পনাতীত ব্যাপার হলেও সত্য, জাপানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৮ জন জীবনের মায়া ত্যাগ করে যাচ্ছেন স্বেছায়। গত বিশ বছর ধরে প্রতিবছরের আত্মহত্যাকারীর সংখ্যাটা ঘুরপাক খায় ৩২ হাজারের আশপাশে। এই সংকট কাটানোর উদ্দেশ্যে দেশটিতে কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠন করা হলেও এর কোনো সমাধান করতে তারা এখনো কোনো কার্যকর ভূমিকা পালনে সক্ষম হচ্ছেন না।

এতক্ষণ বললাম পূর্ব এশিয়ার একটু সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রের কথা, এখন কথা বলা যাক সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা আমাদের বঙ্গভূমি নিয়ে। তরুণদের সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে দেশের আত্মহত্যার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, করোনাকালে গেল এক বছরে সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন নারী-পুরুষ। ২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনটি জাতীয় পত্রিকা, ১৯টি স্থানীয় পত্রিকা, হাসপাতাল ও থানা থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটিতে জানা যায় ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে আত্মহত্যা ৪৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, ২০১৯ সালে সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। এই এক বছরের পার্থক্যে আত্মহত্যার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া ক্রমশই শঙ্কা আর হতাশার চরম মাত্র যোগ করে।

এসব ব্যাপারে আলাপ-আলোচনার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও ওয়েবিনারে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ হতাশ হলে ঠুনকো কারণে নিজের আবেগ ধরে রাখতে অক্ষম। তখন তিনি নিজেকে একা মনে করেন এবং আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। আপাতদৃষ্টিতে, অন্যদের কাছে মৃত্যুর কারণ তুচ্ছ মনে হলেও ঐ একই কারণটি ঐ মুহূর্তে ঐ ব্যক্তির জন্য অনেক বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ সেই ঠুনকো বা তুচ্ছ কারণেও সাধারণ একটা সান্ত্বনার বাণী হয়তো-বা এই সমস্ত আত্মহত্যা কিছুটা হলেও রোধ করা সম্ভব হতো। আত্মহত্যার অনেক বড় একটা অংশ তরুণ বা সদ্য যৌবনে পদার্পণ করা মানুষ, যাদের অনেক বড়ো একটা অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আর বিগত এক বছরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা চোখে পড়ার মতো।

আর্থিক টানাপোড়েন কিংবা জীবনের কিছু পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক চাপ একজন মানুষকে খুব সহজেই আত্মহত্যাপ্রবণ তৈরি করতে সক্ষম। মনে রাখতে হবে, একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিটি যতটা নিজের এবং তার আশপাশের মানুষজন উভয়ের জন্যই সমানভাবে বিপজ্জনক। আমরা বহুবার সাইকোপ্যাথ কিলিংয়ের ব্যাপারেও শুনেছি, জেনেছি। ইন্টারনেট দুনিয়ায় ঘাঁটাঘাঁটি করলে এসব গল্প যতটা মুখরোচক শোনায় বাস্তব জীবনে তা এর চেয়ে বহু গুণ ভয়ানক।

অথচ, এত বিপদ শঙ্কার মধ্যেও দেশে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব প্রদান করার মতো খুব একটা শক্তপোক্ত কোনো সংগঠন কিংবা সরকারি ভর্তুকি চোখে পড়ে না। শুধু তা-ই নয়, সামাজিকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গুরুত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। এমনকি বরং সমাজে প্রচলিত ‘পাগলের ডাক্তার’ শব্দটি ব্যবহার করে এদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয় বলে এই বিষয়টিকে পেশা হিসেবে নিতে অনেকেই চান না। ফলাফলস্বরূপ এই সেক্টরে লোকবলসংকট থেকেই যায়, এবং লোকবলসংকট থাকা একটা সেক্টরে সরকার কর্তৃক আর্থিক বরাদ্দ, প্রণোদনা, সুযোগ-সুবিধা সবকিছুই অবহেলিত থেকে যায়। সর্বোপরি এটিকে একটি অবহেলিত খাত বলা চলে।

একই সঙ্গে মানসিক চিকিত্সা নিতে গেলে একজন মানুষকে সমাজে সরাসরি ‘পাগল’ বলেও আখ্যায়িত করা হয়। এসব স্টেরিওটাইপস এবং অঘোষিত নিষিদ্ধ বলে খ্যাত ব্যাপারগুলোকে স্বাভাবিক করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে পুঁজিবাদী আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন এই সমাজব্যাবস্থায় একজন মানুষ তার মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নের অভাবে খুব সহজেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে বলা যায়, সরকারিভাবে দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বারোপ এবং একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাজের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিকরণ। যাতে করে এই খাতে লোকবল সংকট দেখা না দেয় এবং গবেষণার মাধ্যমে এই সমস্যা আরো বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার আগেই একে বশে আনা যায়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়