বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক এবং পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান আর নেই। গত বুধবার দুপুর ২টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা (ইন্না লিল্লাহি ... রাজিউন) যান। গত ৮ এপ্রিল অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান করোনা আক্রান্ত হন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শামসুজ্জামান খানকে মানিকগঞ্জে মায়ের কবরে দাফন করা হয়।
বিশিষ্ট এই ফোকলোরবিদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান একজন লোক সংস্কৃতি ও পল্লীসাহিত্য গবেষক। তিনি দীর্ঘ সময় বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি অসংখ্য উল্লেখযোগ্য প্রকাশনার কাজ সম্পাদনা করেন। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কর্ম হলো ‘বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা’ শিরোনামে ৬৪ খণ্ডে ৬৪ জেলার লোকজ সংস্কৃতির গ্রন্থমালা সম্পাদনা এবং ১১৪ খণ্ডে বাংলাদেশের ফোকলোর সংগ্রহমালা সম্পাদনা। বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থের সম্পাদনার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন।
অমর একুশে গ্রন্থমালাকে তিনি বারোয়ারী মেলা থেকে প্রকাশকদের মেলায় পরিণত করতে সমর্থ হন। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি সুন্দর বইমেলার রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর সময়েই বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল পরিসরে আয়োজিত হয়ে আসছে।
২০০৯ সালের ২৪ মে শামসুজ্জামান খান বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হন। তার পদের মেয়াদ তিন বার বাড়ানো হয়, যা ২০১৮ সালের ২৩ মে শেষ হয়। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের পহেলা অক্টোবর তিনি কুষ্টিয়ায় বাংলাদেশের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’-এর অধ্যাপক পদে নিয়োগ পান।
অধ্যাপক শামসুজ্জামান খানের বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। তিনি মানিকগঞ্জের সিংগাইরে চারিগ্রামে ১৯৪০ সালের ২৯ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। শামসুজ্জামান খানের বাবা এমআর খান ছিলেন একজন বিখ্যাত অনুবাদক। তার দাদার দাদা এলহাদাদ খান এবং তার ভাই আদালাত খান ঔপনিবেশিক ভারতে অত্যন্ত আলোচিত বুদ্ধিজীবী ছিলেন। শামসুজ্জামান খান মাত্র দুই বছর বয়সে বাবাকে হারান। তার মা এবং দাদি তাকে লালন-পালন করেন।
তিনি ১৯৬৩ এবং ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৬৪ সালে মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেন। একই বছর তিনি জগন্নাথ কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন।
অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান ২০০৯ সালে একুশে পদক ও ২০১৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি ১৯৮৭ সালে অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার ও কালুশাহ পুরস্কার, ১৯৯৪ সালে দীনেশচন্দ্র সেন ফোকলোর পুরস্কার, ১৯৯৮ সালে আব্দুর রব চৌধুরি স্মৃতি গবেষণা পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে দেওয়ান গোলাম মোর্তজা পুরস্কার, ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী জাতীয় গবেষণা পুরস্কার, ২০০৪ সালে মীর মশাররফ হোসেন স্বর্ণপদক লাভ করেন।
জাতীয় পার্টি-জেপির শোক
জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম শামসুজ্জামান খানের ইন্তেকালে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। প্রেরিত বাণীতে তারা বলেন, শামসুজ্জামান খানের শিক্ষা ও বৃদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য জাতি তাকে স্মরণ করবে। শোক বাণীতে নেতৃদ্বয় তার রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।