কাজ ছাড়াই বের হচ্ছেন অনেকে, ফার্মগেটে লাঠিপেটা পুলিশের

করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় আট দিনের কঠোর লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে রাজধানীতে গাড়ির চাপ বেড়েছে। নানা অজুহাতে রাস্তায় বের হয়েছে মানুষ। জানা গেছে, অনেকে বন্ধুকে খেজুর গিফট করতে, গাড়ির জ্বালানি নিতে, ঘুড়ি কিনতে, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে, লকডাউনের পরিবেশ দেখতে, ফাঁকা রাস্তায় ঘুরতে, এমনকি স্বজনের বাড়িতে বেড়ানোর জন্য ঘরের বাইরে বের হয়েছেন। আবার কেউ কেউ এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় গিয়েছেন ইফতারের বাজার করতে। অনেককে মাস্ক ছাড়াই ঘুরতে দেখা গেছে। তবে গত লকডাউনের চেয়ে এবার সড়কে কঠোর অবস্থানে দেখা গেছে পুলিশকে। সব শ্রেণির মানুষকে পুলিশের জেরার মধ্যে পড়তে হয়েছে। কেউ কেউ পুলিশের হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। বিশেষ করে সাংবাদিকরা তাদের কর্মক্ষেত্রের পরিচয়পত্র দেখানোর পরও নানা প্রশ্নের শিকার হয়েছেন। যারা বাসায় হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তাদের হাসপাতালে নিতে বেগ পেতে হয়েছে তাদের স্বজনদের।

এর আগে বুধবার সড়কে গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার জন্য ঢাকার হাইকোর্টের সামনে স্কয়ার হাসপাতালের নাজমুল হক নামে এক চিকিত্সককে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করে ট্রাফিক পুলিশ। তার জরিমানার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ঐ চিকিত্সক দাবি করেছেন যে, তিনি মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসছিলেন। পরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এক পদস্থ কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নিয়ে ভুল বুঝাবুঝির অবসান হয়েছে। ঐ চিকিত্সকের জরিমানার টাকা ফেরত দেওয়া হবে।

সরেজমিনে গতকাল সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত রাজধানীর মগবাজার, হাতিরঝিল, রমনা ও তেজগাঁও সাতরাস্তা ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে সব রাস্তায় চলাচল করা যাচ্ছে না। প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। মোড়ে মোড়ে যানবাহন থামিয়ে চেক করছে পুলিশ।

আজিমপুর, নিউমার্কেট, সাইন্সল্যাব ও কাওরান বাজার এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, সরকারের কঠোর বিধিনিষেধের দ্বিতীয় দিনে সড়কে রিকশা ও মোটরসাইকেল বেশি ছিল। পুরান ঢাকার অলিগলিতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। মানুষের আড্ডারও কমতি ছিল না। লালবাগ খাঁন মোহাম্মদ মসজিদ পার হয়ে রহমত উল্লাহ স্কুলের পাশের গলি, জে এন শাহ রোড, শহীদনগর, কেল্লার মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে এ চিত্র দেখা যায়।

গতকাল দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত ফার্মগেটের মোড়ে মোড়ে ছিল পুলিশের কঠোর অবস্থান। ফার্মগেট মোড়ে কয়েক জন পথচারীকে বিনা কারণে সড়কে বের হওয়ার জন্য এবং মুভমেন্ট পাশ না থাকার কারণে পুলিশকে লাঠি দিয়ে পেটাতে দেখা গেছে। টেকনিক্যাল মোড়ে পুলিশের জেরায় মোটরবাইকের চালক যুবক সোহেল জানান যে, তার এক বন্ধু থাকে কল্যাণপুরে। তার সঙ্গে দেখা করার জন্য তিনি বের হয়েছেন। পুলিশ তাকে ধমক দিয়ে তার বাইক উলটা দিকে ঘুরিয়ে দেয়। সেখানে কর্তব্যরত পুলিশের কনস্টেবল হাবিবুর রহমান জানান, বিভিন্ন অজুহাতে মানুষ ঘর থেকে হচ্ছে। এক ব্যক্তি সিএনজিতে করে তার এক বড় ভাইকে খেজুর গিফট করবে বলে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। তাকে উলটা পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

একই চিত্র দেখা গেছে বিজয় সরণির মোড়ে। পুলিশ আড়াআড়িভাবে ব্যারিকেড বসিয়েছে। প্রতিটি যানবাহন তারা সিগন্যাল দিয়ে থামিয়েছে। যারা অকারণে বের হয়েছেন তাদের আর্থিক জরিমানা করেছে পুলিশ।

সড়কে চলমান রিকশাচালক এবং তার যাত্রীদের মাস্ক ব্যবহারেও কিছুটা উদাসিনতা দেখা গেছে। রহিম মিয়া নামে এক রিকশাচালক বলেন, ‘যে পরিমাণ সইলে­র তন পানি বাইর হইয়া যায়, আমাগো করোনা হইবো নাগো। মুখের মইদ্দে মাক্স... লাগাইলে দম বন্ধ হইয়া যাইতে লাগে।’ একই রিকশার যাত্রীর কাছে কেনো মাস্ক পরেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাস্তায় এখন মানুষ কম। তাই না পরলেও সমস্যা হওয়া কথা না।’

পাঠাও, উবার বন্ধ থাকলেও চুক্তিতে চলেছে মোটরসাইকেল। নীলক্ষেত মোড়ে গিয়ে মোটরসাইকেলের চালক ও যাত্রীর মধ্যে দরকষাকষি করতে দেখা গেছে। সাইদুর রহমান নামে এক জন উত্তরা হাউজ বিল্ডিংয়ে যাবেন। মোটরসাইকেল চালকের কাছে ভাড়া জিজ্ঞাসা করলে চালক ৫০০ টাকা চান। এ সময় রাস্তায় পুলিশ ধরলে কী বলবেন? জানতে চাইলে চালক বলেন, ‘পকেটে টাকা নাই। সংসারে খাওন নাই। এজন্যে বাইর হইছি। পরে কি হইবো জানি না।’

সরকারের বিধিনিষেধে উন্মুক্তস্থানে কাঁচাবাজার বসানোর কথা থাকলেও তা দেখা যায়নি। মিরপুরের পাইকপাড়ার কাঁচাবাজারে ক্রেতাদের হুড়োহুড়ি দেখা গেছে। কাঁঠালবাগানে সিটি করপোরেশনের কাঁচাবাজারে ক্রেতাদের হুড়োহুড়ি ছিল। তবে বিকালের দিকে কলাবাগান থানা পুলিশের একটি টিম কাঁচাবাজারে উপস্থিত হয়ে ক্রেতাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে।

ঢাকার বড় তিন টার্মিনাল মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। এছাড়া ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে কঠোর নজরদারি বসায় পুলিশ। শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত যানবাহনগুলো ঢাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে।