সময় এখন কাজ করিবার

কেমন আছে এই বিশ্ব? করোনায় বিশ্বে ৩০ লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হইয়াছে। আক্রান্ত হইয়াছে প্রায় ১৪ কোটি মানুষ। এই হিসাব চলমান। কবে ইহাতে দাঁড়ি পড়িবে কেহ জানে না। বলা যায়, গত সোয়া এক বত্সর ধরিয়া দমবন্ধ অবস্থার ভিতর দিয়া এই বিশ্ব একটি অচিন্তনীয় এবং অপ্রত্যাশিত দুর্বিপাকে আটকাইয়া গিয়াছে। সামান্য কিছু পরিসংখ্যানই বুঝাইয়া দেয় কেমন আছে বিশ্ববাসী। সার্বিকভাবে চলতি বত্সর বিশ্ব অর্থনীতি সাড়ে ৫ শতাংশ সংকুচিত হইতে পারে—এমন পূর্বাভাস দিয়াছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাড। আমরা তো এই বিশ্বেরই অংশ। আমরা তাহা হইলে কেমন আছি?

গত বত্সর করোনা সুনামি শুরুর পূর্বেই আমাদের অর্থনীতির যে খারাপ সময় যাইতেছে—তাহা বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) ব্রাঞ্চ ম্যানেজারদের বার্ষিক কার্যক্রম প্রণয়ন সম্মেলন ২০২০-এ অর্থমন্ত্রী স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন। তিনি তখন বলিয়াছিলেন যে, কোনো দেশেই আমদানি-রপ্তানি সঠিকভাবে হইতেছে না; ব্যাংকিং খাতের অবস্থা ভালো নহে; দেশের অর্থনীতিতে প্রাইভেট সেক্টরের প্রবৃদ্ধি কমিয়াছে...ইত্যাদি। মনে রাখিতে হইবে, কথাগুলি তিনি বলিয়াছেন করোনা বিপর্যয় শুরুর পূর্বে। আর বর্তমানে যেই অমানিশা জাঁকিয়া বসিয়াছে তাহাতে অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা বুঝিতে গবেষক হইতে হয় না। গত এক বত্সরে কোটি কোটি মানুষের রুটি-রুজিতে টান পড়িয়াছে, ব্যাপকভাবে কর্মী ছাঁটাই হইয়াছে। সমস্ত কিছুই একটি চেইনের অংশ হওয়ায় রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি দেখা গিয়াছে। রপ্তানি আদেশ কমিয়া যাওয়া, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান তৈরি না হইবার মতো সমস্যা আরো বাড়িয়াছে। পাশাপাশি হিমশিম খাইতে হইতেছে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে। ক্রমশই বাড়িতেছে সরকারের ঋণের পরিমাণও। এতসব নেতিবাচক খবরের মধ্যে অনেকেই আমাদের রেমিট্যান্স-প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও কৃষি খাতের উন্নতির কথা বলিয়া থাকেন। তবে রেমিট্যান্স লইয়া একটি পূর্বাভাস হইল, করোনার কারণে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী দেশে আসিয়াছেন এবং দীর্ঘদিনের সঞ্চয় দেশে পাঠাইয়াছেন বিধায় রেমিট্যান্সের স্ফীতি সাময়িকভাবে বাড়িয়াছে। কিন্তু ভবিষ্যতে এই গ্রাফ একইভাব বৃদ্ধি পাইবার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে, পৃথিবীর অনেক দেশেই অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্য, মানবিক ও খাদ্য—এই চারটি বিপর্যয়ের মধ্য দিয়া গিয়াছে, কিন্তু আমরা শেষেরটি অর্থাত্ খাদ্য বিপর্যয়ে পড়ি নাই। কিন্তু এইবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউতে সেই আশঙ্কাও দেখা দিয়াছে। চালের বাজারের কথাই ধরা যাউক। শুল্ক কমাইয়া বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি শুরুর পর বাজারে কিছুটা কমিয়া আসিয়াছিল চালের দাম। তবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না আসায় চালের শুল্ক আরো কমাইয়া ১০ শতাংশে নামাইয়া আনা হয়। কিন্তু দেশব্যাপী লকডাউন এবং সর্বাত্মক সাধারণ ছুটির ঘোষণায় অস্থির হইয়া উঠিয়াছে চালের বাজার। অনেকে মনে করেন, আমদানি-প্রক্রিয়া প্রতিযোগিতামূলক হয় নাই। বিশ্ববাজারেও চালের বাজার ভালো নহে। সুতরাং বিপর্যয়ের ষোলোকলা পূর্ণ হইতে সময় নাও লাগিতে পারে।

এই যখন অবস্থা, তখন আপাদমস্তক দর্পণে নিজেদের কি দেখিতে পারিতেছি আমরা? বুঝিতে কি পারিতেছি আমাদের পূর্ণ অবয়ব? আত্মোপলব্ধি কি ঘটিতেছে আমাদের ভিতরে? আত্মসমালোচনা করিবার মতো পরিণত বোধ কি আমাদের রহিয়াছে? নাকি এখনো আত্মম্ভরিতায় আমরা গর্জন করিব—কিছুই হয় নাই আমাদের, সকল কিছু ঠিকই আছে! প্রশ্ন হইল—বিশ্বের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পরিসরে আমাদের ভালো থাকিবার কতখানি অবকাশ রহিয়াছে? কথায় আছে—হাতি ঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার কণিকা গ্রন্থে ‘সন্দেহের কারণ’ কবিতায় বলিয়া গিয়াছেন—কত বড়ো আমি, কহে নকল হীরাটি।/ তাই তো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি।’ আমরা মনে করি, সময় এখন আলগা গরিমায় নিজেদের ধোঁকা দেওয়ার নহে, সময় এখন কাজ করিবার। কর্মেই মুক্তি।