ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালু কণা বিন্দু বিন্দু জল—সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে এ কথাটি চরম সত্য। আয়-ব্যয়-সঞ্চয় এই শব্দগুলো অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা যে আয় করি, পাশাপাশি তা খরচও করি। আমাদের চাহিদার শেষ নেই। এক প্রয়োজন পূরণ হতেই নতুন আরো অনেক প্রয়োজন জীবনে এসে হাজির হয়। ফলে প্রতিনিয়তই ব্যয় হচ্ছে, কিন্তু আমরা অনেকেই সঞ্চয় করি না বা করার কোনো পরিকল্পনা হাতে রাখি না। আর সময়মতো সঞ্চয় না করলে, ভবিষ্যত্ অনেক সময় আমাদের কাছে অন্ধকার মনে হয়।
অনেকে এ করোনা মহামারির মধ্যে ধীরে ধীরে সঞ্চিত জমানো টাকা খরচ করছে। এটা বিপদের বন্ধুর মতো কাজ করছে, মনে হয় যেন বিপদের সময় যক্ষের ধন, বিপদের অতি আপনজন। আসলে সঞ্চয় ভবিষ্যতে এ ধরনের যে কোনো বিপদে বর্মের ভূমিকা পালন করে।
বৃদ্ধ বয়সে অবসরকালে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, বিয়ে, হঠাত্ অসুস্থ হলে চিকিত্সা ব্যয় মেটানো ইত্যাদি নানা প্রয়োজনে সঞ্চয় খুব উপকারে আসে। তাই ভবিষ্যতে অর্থের সংকট মেটাতে সঞ্চয় করার অভ্যাস করা জরুরি। কালকের কথা চিন্তা না করে আজ থেকেই অল্প অল্প সঞ্চয় করা উচিত। হতে পারে সেটা মাটির ব্যাংক, বেসরকারি সংস্থা বা কোনো তফসিলি ব্যাংক।
আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সঞ্চয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করা আমাদের সবার দায়িত্ব। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সঞ্চয়ের জন্য ভবিষ্যত্ এবং বর্তমান জীবনের একটি সঠিক পরিকল্পনার সমন্বয় করতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মনোনিবেশ করতে হবে সঞ্চয়ে। জীবনে আমরা অনেকেই অনেক অপ্রয়োজনীয় কাজ করে থাকি, যেগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে না করলে তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। যেমন অযথা শপিং করা, কোথাও ঘুরতে যাওয়া, অযথা কাউকে উপহার দেওয়া বা খাওয়ানো এগুলো ত্যাগ করলে যে কারো সঞ্চয়ের মাত্রা অনেক বেশি বেড়ে যেতে পারে।
জীবনের প্রথম আয় থেকেই সঞ্চয় শুরু করা উচিত। একজন লোক যত বেশি মিতব্যয়ী, তার সঞ্চয়ের পরিমাণও তত বেশি। তবে মিতব্যয়িতার অর্থ কৃপণতা নয়। সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও বিলাসিতা নিয়ন্ত্রণ করেই সঞ্চয় করা উচিত। এজন্য উত্পাদন ও আয় বাড়াতে সদা সচেষ্ট হতে হবে। আয়ের সঙ্গে সমন্বয় রেখে খরচ করে সঞ্চয় করার অভ্যাস করা জরুরি। তবে সঞ্চয়ের মূল টাকা খরচ করা সুবিবেচনার কাজ নয়। সঞ্চয়কৃত মুনাফার টাকা বিশেষ প্রয়োজনে খরচ করা যেতে পারে।
শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সঞ্চয়ের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। সঞ্চয় করার জন্য প্রয়োজন আগ্রহ বা ইচ্ছা। অর্থ সঞ্চয়ের জন্য বর্তমানে ব্যাংকগুলো অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। ইচ্ছে করলে এই সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে অর্জিত অর্থের কিছু অংশ বিনিয়োগও করা যেতে পারে। এভাবে ফিক্সড ডিপোজিট করতে পারলে অর্থ সঞ্চয় করার পাশাপাশি অতিরিক্ত মুনাফাও অর্জন করা যায়। সঞ্চয় করার জন্য ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সুনাম, সুখ্যাতি ও নিবন্ধিত কি না তা যাচাই করে নিতে হবে।
ভবিষ্যতের স্বপ্নের সিঁড়ি বাস্তবায়নের জন্য সাধ্যমতো সঞ্চয় করা উচিত। সঞ্চয় দেশের অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করে এবং উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে গতিশীল করে। সঞ্চয়ে বিনিয়োগে কোনো ঝুঁকি নেই, এজন্য সঞ্চয়কে বলা হয় ভবিষ্যতের সবচেয়ে ভালো বন্ধু ও উত্তম বিনিয়োগ। সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে—ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দু গড়ে তোলে সিন্ধু।
ঢাকা