সাধন সরকার
মানুষ-প্রকৃতি-পরিবেশ নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। গাছ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন, ফল, কাঠ, ছায়া, দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা ও ওষুধের কাঁচামালের উত্স। কিন্তু সেই গাছই যদি মানুষ-প্রকৃতি-পরিবেশের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনে তাহলে তা নিশ্চয় উদ্বেগের বিষয়। এমনই একটি বিদেশি গাছ হলো ইউক্যালিপটাস। গাছটি বেশি দেখা যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। সরকারি-বেসরকারি বেশিরভাগ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গাছ রয়েছে। রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাসমূহ ও আশপাশের জেলাসমূহের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইউক্যালিপটাস গাছ সবচেয়ে বেশি। প্রশ্ন হলো, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ইউক্যালিপটাস গাছ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন? বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখনো দেশি ও বিদেশি গাছ আলাদা করতে পারে না। তাই গাছের উপকার-অপকার সম্পর্কে অনেকেই ওয়াকিবহাল নয়। ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কিছু বিদেশি গাছ এদেশের পথে-প্রান্তরে দেশি গাছের মতো করে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সত্য, তবু বিদেশি গাছ দেশি গাছের মতো সামগ্রিক পরিবেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না।
বিদেশি প্রজাতির ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছ এখন সবখানেই দেখা যায়! ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের ক্ষতিকর প্রভাব অনেক। ইউক্যালিপটাস গাছ প্রচুর অক্সিজেন শোষণ করে এবং নাইট্রোজেন ত্যাগ করে। প্রচুর পানি শোষণ করার ফলে এই গাছ আশপাশের জমির পানি শুষে নেয়। এই গাছ কৃষিজমির গুণাগুণ ও উর্বরতা শক্তি নষ্ট করে। ইউক্যালিপটাস গাছের পাতা ও ডালপালা পচতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, ফলে অজৈব পদার্থের মতো এই গাছের ঝরা পাতা জমির ক্ষতি করে। ইউক্যালিপটাস গাছ অক্সিজেন শুষে নেওয়াসহ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় আশপাশের অন্যান্য গাছের খাদ্য তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও ব্যাহত হয়। এই গাছে পাখিও বসতে চায় না! জানা যায়, ১৯৬০ সালের কাছাকাছি সময়ে ইউক্যালিপটাস গাছ বাংলাদেশে আনা হয় এবং সরকারি উদ্যোগেও সামাজিক বনায়নের আওতায় রোপণ করা হয়। আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাস গাছে কোনো ফল হয় না, শুধু দ্রুত সময়ে কাঠের আশায় এটা লাগানো হয়ে থাকে। কিন্তু দেশি গাছে ফল ও কাঠ দুটোই হয়। ইউক্যালিপটাস গাছে অন্য গাছের তুলনায় অতিরিক্ত তেল থাকায় এটা বেশ দাহ্যও বটে। এই গাছের আবাসভূমি অস্ট্রেলিয়াতেও একে অগ্নি সৃষ্টিকারী হিসেবে ধরা হয়। জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ, প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্যের স্বার্থে ইউক্যালিপটাস গাছ রোপণ বন্ধ করা জরুরি। ২০০৮ সালে সরকার ইউক্যালিপটাস গাছের চারা উত্পাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ করেই দায় সেরেছে। ফলে এখনো বন্ধ হয়নি ইউক্যালিপটাস গাছের চারা উত্পাদন, বিপণন ও রোপণ।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগে দেশি গাছের পরিচিতি ও গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। বিদেশি নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেশি গাছ লাগাতে হবে। বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা ও পরিবেশদূষণ রোধে দেশি গাছের বীজ সংরক্ষণ, দেশি গাছ উত্পাদন ও বিপণনে দেশের নার্সারিসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। আগ্রাসী ইউক্যালিপটাসসহ ক্ষতিকর বিদেশি গাছের উত্পাদন ও বিপণনে সরকারকে এখনই জোরালোভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে এবং সচেতনতা বাড়াতে হবে। নতুন প্রজন্মকে দেশি গাছের প্রতি ভালোবাসা জাগাতে হবে। দেশি গাছ বাঁচলে আমাদের প্রকৃতি বাঁচবে, দেশ বাঁচবে।
ঢাকা