অনুপম হায়াত্
কবরী আপার সঙ্গে আমার আত্মীক সম্পর্ক ছিল। দীর্ঘ জীবনে তার সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়েছে আছে। উনি যখন চলচ্চিত্রে আসেন তখন আমি গ্রামে থাকতাম। পত্র-পত্রিকা পড়ার অভ্যেস ছিল। একদিন পত্রিকায় দেখলাম কৌতুক অভিনেতা সুভাষ দত্ত একজন বাঙালি মেয়েকে নিয়ে বাংলা ছবি নির্মাণ করছেন। তখন একটা আকর্ষণ অনুভব করলাম। ১৯৬৪ সালেও ২৩ এপ্রিল ‘সুতরাং’ ছবিটি মুক্তি পেলে দলবেঁধে দেখতে গেলাম। ছবিটি দেখে তার চাহনি, কথা বলার ধরন দেখে শুধু অবাক নয়, ভক্তবনে গেলাম। এরপর ১৯৬৬ সালে ঢাকা চলে এলাম। এখানে এসে ‘রংবাজ’ ছবিটি দেখে তার একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে গেলাম। রাজ্জাকের সঙ্গে তার অভিনয় সিনেপ্রেমীরা আজীবন ভুলতে পারবে না। ভারতীয় সিনেমা নিষিদ্ধ হলেও সে সময় উর্দু ছবির একছত্র আধিপত্য বিরাজ করতো। তখন কবরীর মাঝে বাঙালি দর্শকরা প্রত্যাশা খুঁজে পেতেন। তার গ্রামীণ, মধ্যবিত্ত চরিত্রে অভিনয়, তার শাড়ি পরার স্টাইল, হাঁটাচলা মুগ্ধ করতো সবাইকে। এই মুহূর্তে একটি কথা খুবই মনে পড়ছে। তখন আমি যাত্রবাড়ি একটি মেসে থাকি। কখন স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র খুব শুনতাম। হটাত্ শুনলাম এখন ভাষণ দিচ্ছেন কবরী। অবাক হয়ে গেলাম। সেই ভাষণে তার যে কান্না, বাঙালিদের হত্যার বিরুদ্ধে সারাবিশ্বের কাছে তার যে আবেদন তা আজো কানে বাজে। কবরীর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা সাংবাদিকতার সূত্রে। তখন ‘সারেং বৌ’ ছবির ডাবিং চলছিল। প্রথম দেখাতেই অনেক আপন করে নিলেন। এরপর বিচিত্রা ও তারকা আলোতে কাজের সূত্রে তার তার সঙ্গে যোগাযোগ আরো গভীর হতে থাকলো। এরপর ‘আবহমান বাংলার প্রতীক কবরী’ শিরোনামে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কবরীকে নিয়ে একটি স্টোরি প্রকাশ করি। যেটা খুবই শ্রোতাপ্রিয় হয়। পরবর্তীতে চ্যানেল আইয়ে ‘চলচ্চিত্রে স্মরণীয় বরণীয়’ নামে একটি প্রোগ্রাম করতাম। সেই অনুষ্ঠানে একদিন অতিথি হয়ে কবরী এলেন। তার অভিনীত বিভিন্ন ছবির চরিত্র নিয়ে এত সুন্দর করে বললেন, যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর হয় উনি যখন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবের সভাপতি নির্বাচিত হন। তখন আমি মিডিয়া কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব পাই। কাজ করতে গিয়ে উনি এত বেশি আমার ওপর ভরসা করতে লাগলেন যে, অতিথিদের আপ্যায়ন, অনুষ্ঠান করা থেকে শুরু করে অনেক দায়িত্ব দিলেন। এরপর সভাষ দত্ত, চাষী নজরুল ইসলামের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের দায়িত্ব আমাকে দিলেন। কবরী আসলে একজন ভার্সেটাইল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল পড়াশোনা খুব বেশি না করলেও নিজ গুণে ভালো ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি বলতে পারতেন। একটি সাধারণ পরিবার থেকে এসে এত দূর অবধি যাওয়া সত্যি অনুকরণীয়। তার চরিত্রগুলোর মাঝে আবহমান বাংলার মা, বোন, প্রেমিকাকে খুঁজে পেতেন দর্শকরা। যতদিন পৃথিবী থাকবে ততিদন তিনি বাংলার রমনীদের প্রতীক রূপে বেঁচে থাকবেন। তার এই চলে যাওয়া নক্ষত্রের পতন ছাড়া কিছু নয়। সৃষ্টিকর্তা তাকে অনেক শান্তিতে রাখুন, এই প্রার্থনা করি।
লেখক :চলচ্চিত্র গবেষক, শিক্ষক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব