যুদ্ধ থেকে করোনা যুদ্ধ—যখনই ভারত বৃহত্তর কোনো সমস্যায় পড়েছে, তখনই ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে রাশিয়া। গত কয়েক সপ্তাহে কোভিড-১৯-এর মতো সংক্রামক রোগ যখন দ্বিতীয় বারের জন্য ভারতকে গ্রাস করেছে, তখনো দিল্লির সরকার বুক ফুলিয়ে বিষয়টি অতটা গায়ে মাখছে না। এবার আমরা কোভিড টিকা উত্সব করব। আর ভারতের তৈরি দুটি ভ্যাকসিন—কোভিশিল্ড ও কোভ্যাক্সিনের ভাঁড়ার শূন্য হয়ে গিয়েছে। তাই তড়িঘড়ি মস্কোয় পুতিনকে ফোন—আপনারা আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাশিয়ায় তৈরি ভ্যাকসিন স্পুটনিক ভি পাঠান। মস্কো চটজলদি রাজি হয়ে গিয়েছে। ভারতের কোভিড বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, রাশিয়ার তৈরি স্পুটনিক ভি শতকরা ৯৫ ভাগ সফল। অথচ ভারত সরকার গোড়াতেই মস্কোর তৈরি টিকা নিতে অস্বীকার করেছিল। এখন ভারত সরকারের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক বছর বয়স থেকে নিরানব্বই বছর বয়স পর্যন্ত প্রত্যেককে এই টিকা দিতে হবে। এদিকে ভারতের কোভিশিল্ড আর কোভ্যাক্সিন উত্পাদকেরা বলছেন, ভারতের উত্পাদনকারী সংস্থাগুলিকে আরো টিকা উত্পাদনের জন্য মোদি সরকারকে আরো ৩ হাজার কোটি টাকা অগ্রিম দিতে হবে। এই অগ্রিম টাকা দেওয়া হবে কি হবে না, সে ব্যাপারে এই লেখা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এই বৃহত্ দেশের রাজ্যে রাজ্যে করোনা টিকার জন্য হাহাকার পড়ে গিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ। এ রাজ্যে বর্তমানে চলছে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার ও ভোটগ্রহণ। এই নির্বাচনি প্রচারে দিল্লির শাসকদল ইতিমধ্যে নির্দেশ দিয়েছে, শাসকদলের বড় নেতারা যেসব জায়গায় সভা করবেন, সেসব জায়গায় কমপক্ষে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ মানুষের সমাগম চাই। ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মিনিটে ১১৭ জন করে ভারতীয় নাগরিক এই দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রতি ঘণ্টায় মারা যাচ্ছেন ৩৮ জন মানুষ। ভারতে ১৩৮ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ কোভিশিল্ড বা কোভ্যাক্সিন টিকা নিয়েছেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভুটানে নিয়েছেন ৬০ শতাংশ মানুষ। এদিকে কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের পাঁচতারা হাসপাতালগুলিতে নোটিশ টাঙিয়ে দিয়েছে—কোভিড রোগীদের জন্য কোনো শয্যা নেই। অনেক বেসরকারি হাসপাতালও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় রাজ্য সরকার কোভিড মোকাবিলা করবে, না নির্বাচনি প্রচার করবে! মাস্ক বাধ্যতামূলক হলেও নির্বাচনি সভাগুলিতে যারা যোগ দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে শতকরা পাঁচ জনেরও মুখে মাস্ক দেখা যাচ্ছে না।
গেল বুধবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী উত্তরবঙ্গে প্রচারে এসে কেন্দ্রীয় সরকারকে কটাক্ষ করে বলেছেন, ১৫-১৬ মাস আগে যখন ভারতে প্রথম পর্যায়ে করোনা সংখ্যা হুহু করে বাড়ছিল, তখন ভারত সরকার দেশের ১৩৮ কোটি মানুষকে কাঁসার-ঘণ্টা, থালা-বাটি বাজিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে এই রোগের মোকাবিলা করার নিদান দিয়েছিল। দেশের লোক তা-ই করেছিল। রাহুলের প্রশ্ন, ঘণ্টা বাজিয়ে বা মোমাবাতি জ্বালিয়ে কোভিড-১৯-এর মতো অতিমারিকে কি নিয়ন্ত্রণ করা যায়? গত সোমবার ও মঙ্গলবার মিলিয়ে সারা দেশে প্রায় ৪ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। আর পশ্চিমবঙ্গে গড় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। কিন্তু দেশের মানুষকে এই মহাব্যাধি থেকে সুস্থ করে তোলার উপায় কী? রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনি প্রচারে গিয়ে সবাইকে টিকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। অথচ একই সঙ্গে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের ভ্যাকসিন দিচ্ছে না। একদিকে হাসপাতালে শয্যা নেই, ওষুধ নেই, টিকা নেই; অন্যদিকে ঘরে ঘরে মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম পরিস্থিতির ভয়ংকর অবস্থা তুলে ধরছে। ব্রিটিশ আমলে দুর্ভিক্ষের সময় ঘরে ঘরে মানুষের একটাই দাবি ছিল—ভাত চাই ভাত দাও; ফ্যান চাই ফ্যান দাও। আর এখন শহরে-গ্রামে-গঞ্জে একটাই আওয়াজ—কোভিডের টিকা দাও। অক্সিজেন দাও। অধিকাংশ হাসপাতালে অক্সিজেনের জোগানে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। প্রথম দফার তুলনায় দ্বিতীয় দফায় মহারাষ্ট্রে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি টিভি চ্যানেলে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছেন, দয়া করে আপনি মহারাষ্ট্রের জন্য সামরিক বিমানে অক্সিজেন সিলিন্ডার পাঠান। রাজ্যে অধিকাংশ হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডারের ভাঁড়ার শূন্য। বহু হাসপাতাল বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। শুধু দেশ নয়, বিদেশের বহু বড় দেশ থেকে মানুষ মুম্বাইয়ে আসতেন চিকিত্সার জন্য। তারাও এখন নিরুপায়। বাংলাদেশ থেকে কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালসহ একাধিক পাঁচতারা হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য বহু রোগী আসেন। এসব হাসপাতালের সামনে নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে—আমাদের শয্যা নেই। অক্সিজেন নেই। রোগী ভর্তি বন্ধ। আপাতত কোনো রাজ্য সরকারই লকডাউন ঘোষণা করতে চাইছে না। পরিবর্তে ১২ ঘণ্টার নৈশ কার্ফু জারি করেছে অধিকাংশ রাজ্যই। কারণ লকডাউন ঘোষণা করা হলে হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক নিজ নিজ রাজ্যে ফেরার উদ্যোগ নেবেন। বহু জায়গায় ইতিমধ্যেই পরিযায়ী শ্রমিকরা নিজের রাজ্যে ফিরতে শুরু করেছেন। তাদের দুর্দশাও জাতীয় চ্যানেলগুলিতে দেখানো হচ্ছে।
এক কথায় বলতে গেলে ভারত এখন করোনা মহামারিতে ভয়ংকরভাবে আক্রান্ত। এমনই আক্রান্ত যে, বাংলা নববর্ষে আত্মীয়স্বজনরাও কেউ কারো বাড়িতে যাচ্ছেন না। রাজ্য বিধানসভার ভোটগ্রহণ শেষ হবে ২৯ এপ্রিল। এর মধ্যে রাজ্যে করোনার প্রকোপ আরো বাড়বে। কারণ নির্বাচনি প্রচারে করোনা বিধি মানা হচ্ছে না। মাস্ক ব্যবহার করছেন না অনেকেই। এভাবে বাড়তে থাকলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এই মহাসংক্রামক ব্যাধি। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, সচেতন হওয়ার কথা, প্রকাশ করছেন চিকিত্সা পরিকাঠামো নিয়ে আশঙ্কার কথা। কিন্তু কে কার কথা শোনে!
n লেখক : ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক