বিনিয়োগ আকর্ষণে কর কাঠামো অন্যতম বাধা : ব্যবসায়ীদের অভিমত

 ‘কর না দিলে কালোটাকায় সাড়ে ২২ শতাংশ লাভ’ 

ইত্তেফাক রিপোর্ট

সরকার স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নানামুখী উদ্যোগ নিলেও অন্যান্য চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বিদ্যমান কর কাঠামোকে অন্যতম বাধা হিসেবে দায়ী করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তারা বলেন, এ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। গতকাল শনিবার বিদেশি বিনিয়োগসংক্রান্ত এক অনলাইন সেমিনারে (ওয়েবিনার) তারা এসব কথা বলেন। ‘এফডিআই ফর এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন অ্যান্ড স্মুথ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন’ শীর্ষক ঐ ওয়েবিনারের আয়োজন করে অর্থনীতি বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)। এতে সহযোগিতা করে দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ও রিসার্স পলিসি ইনটিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)।

ইআরএফের সহসভাপতি এম শফিকুল আলমের সভাপতিত্বে ঐ ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, এই পরিস্থিতিতে (করোনা অতিমারি) জিডিপি এগুচ্ছে, আপনারা আয় করতে পারছেন—এটা ইতিবাচক। ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা বক্তব্য দেন। বিষয়ভিত্তিক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও এমসিসিআইর সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, বর্তমান কর প্রদান পদ্ধতি ব্যবসাবান্ধব নয়। বর্তমান কর ব্যবস্থাপনায় ব্যবসা বন্ধই করে দেওয়া উচিত। এটি ঠিক না হলে বিদ্যমান ব্যবসাই থাকবে না, নতুন ব্যবসা তো দূরের কথা। এনবিআরকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তার চেয়ে বলুন, আপনারা বিনিয়োগ চান না। তিনি বিনিয়োগ আকর্ষণে এলোমেলো চিন্তা না করে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘ব্র্যাশফায়ার শুট নয়, স্নাইপার শুট’ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করুন।

 বিদ্যমান কর কাঠামো নিয়ে অসন্তোষের কথা জানান ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমানও। তিনি কর কাঠামোর সংস্কারের পরামর্শ দিয়ে বলেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করহার অনেক বেশি। এ সময় সরকারের কালোটাকা বিনিয়োগের প্রসঙ্গও তোলেন। তিনি বলেন, কর না দিলে সাড়ে ২২ শতাংশ লাভ। কেননা কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ থাকায় কর দিতে হয় মাত্র ১০ শতাংশ। তা হলে বোকার মতো কেন ট্যাক্স দেব? এছাড়া কালোটাকা পুঁজিবাজার ও আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ নেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, কালোটাকা পুঁজিবাজারে ঢোকার পর ২০১০ সালে কী হলো? আমরা কী আবারও সেই পথে যাচ্ছি? পুঁজিবাজার ও আবাসনে না দিয়ে এই সুযোগ স্বাস্থ্য খাত, অবকাঠামোসহ এ ধরনের খাতে দেওয়া এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য খাতকেও সমান সুবিধা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

বক্তারা বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণে দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনেক আলোচনা হলেও অগ্রগতি প্রত্যাশিত নয়। ড. এম এ রাজ্জাক বর্তমান করোনা ভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেন। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিযোগী অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ অনেক কম বলেও উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ একই সময়ে কম্বোডিয়ায় এই বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৪ বিলিয়ন ডলার আর ভিয়েতনামে ১৬১ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে বার্ষিক বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ জিডিপি মাত্র এক শতাংশের মতো আর ভিয়েতনামে তা প্রায় ৬ শতাংশ। অথচ সরকারের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাসহ অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বিনিয়োগের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ তথা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতির পথে বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছর রপ্তানিতে বিদ্যমান সুযোগ পেতে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যেই ইউরোপ, কানাডাসহ বড় বাজারগুলোতে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যদিকে বিনিয়োগ আকর্ষণে চলমান সীমাবদ্ধতা দ্রুত সমাধান করা বিশেষত ব্যবসা সহজ করার সূচকে উন্নতি করার পরামর্শ দেন।

এমসিসিআইর সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবীর সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতা ও অদূরদর্শিতার একাধিক উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, এভাবে দেশ এগিয়ে যাবে না। টার্গেটেড পলিসি নিতে হবে। তিনি সরকারের একটি প্রজ্ঞাপন তুলে ধরে বলেন, মাত্র দুটি কোম্পানির জন্য একটি বিষেশ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ঐ পণ্য কি অন্য কোম্পানি তৈরি করে না?

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেন। এক্ষেত্রে বিডার পাশাপাশি অন্য সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ঘাটতিকে ইঙ্গিত করে বলেন, দেশে কর্মরত বিদেশি ৫০ হাজার কর্মীর জন্য টিকা চাওয়া হয়েছিল। একাধিক সভা এবং চিঠি দেওয়ার পরও তা এখনো হয়নি। তারা এই টিকা পেলে তো ইতিবাচক বার্তা যেত। অবশ্য বিনিয়োগ আকর্ষণে বিডার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন তিনি।

এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ, র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ প্রমুখ।