রায়েরবাজারের গোরখোদকরা অগ্রিম কবর খুঁড়িয়া রাখিতেছেন। এই ধরনের একটি আলোকচিত্র ৯ দিন পূর্বে ইত্তেফাকে ছাপা হইয়াছিল। সম্প্রতি অন্যান্য পত্রিকাতেও প্রকাশ পাইয়াছে যে, রায়েরবাজার কবরস্থানে করোনায় মারা যাওয়া লোকজনকে দাফন করিবার জন্য অন্তত ৫০টি নূতন কবর অগ্রিম খুঁড়িয়া রাখা হইয়াছে। সেই খুঁড়িয়া রাখা কবরের এবড়োখেবড়ো মাটি অপেক্ষা করিতেছে নূতন লাশের জন্য। ইহা যেন প্রতীকীভাবে প্রকাশ করিয়া দিতেছে করোনায় মৃত্যুর গতিকে।
করোনার প্রথম ঢেউ আমরা বহুলাংশে সামলাইয়া উঠিয়াছিলাম বটে, কিন্তু চিন্তা করিতে পারি নাই ইহার দ্বিতীয় ঢেউয়ের অভিঘাত প্রথমটি অপেক্ষা অনেক ভয়ংকর হইবে। লকডাউন চলিতেছে। তবে এই লকডাউনের মধ্যেও রহিয়াছে শুভংকরের ফাঁকি। উন্নত বিশ্বে যেইভাবে সত্যিকারের লকডাউন দেওয়া হয় তাহা আমাদের দেশে সম্ভব কি না—উহা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্ন, এখন মৃত্যুর লাগাম টানিয়া ধরিবার ব্যাপারে। আমরা কীভাবে করোনাজনিত মৃত্যুর রাশ টানিতে পারিব? ইহার ব্যাপারে সারা বিশ্বের সিংহভাগ বিশেষজ্ঞ বলিতেছেন, মৃত্যুর সংখ্যা কমাইতে করোনার টিকাকরণের বিকল্প নাই। যদিও করোনার টিকা লইয়া অনেক ধরনের সংশয় রহিয়াছে। কিন্তু টিকা লইতে সুরক্ষা যে প্রায় নিশ্চিত—ইহা প্রমাণিত প্রায়। বিশেষ করিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকান রূপটির ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন সবচাইতে অধিক উচ্চারিত হইয়াছে। তবে আশার কথা হইল, তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিসিন গবেষকরা নূতন গবেষণায় জানাইয়াছেন, টিকার দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণের ১৪ দিন পর সমীক্ষায় অংশ নেওয়া এক জনও দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টে সংক্রমিত হন নাই। অন্যদিকে ভারতীয় গবেষকরা জানাইয়াছেন যে, টিকা লইবার পর কোভিড সংক্রমণ হইবে না—ইহা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নহে বটে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল, পুরা টিকা অর্থাত্ দুইটি ডোজ লইবার নির্দিষ্ট সময় পর নূতন করিয়া সংক্রমণের সম্ভাবনা ক্ষীণ হইয়া যায়। কেবল তাহাই নহে, করোনায় সংক্রমিত হইলেও তাহাতে মৃত্যুঝুঁকি থাকে না বলিলেই চলে। টিকার এই সুরক্ষার দিকটিকে অনেক বিশেষজ্ঞ হেলমেটের সহিত তুলনা করিয়াছেন। অর্থাত্, হেলমেট পরিলেই দুর্ঘটনা ঘটিবে না—এমন নহে। দুর্ঘটনা ঘটিতেই পারে; কিন্তু আঘাত কম লাগিবে। টিকাও তদ ূপ সুরক্ষা দিয়া থাকে।
সত্যিকার অর্থে, টিকাতে মৃত্যু না হওয়া কিংবা হাসপাতালে না যাইবার মতো সুরক্ষা পাইলেও উহা বিশাল ব্যাপার। সুতরাং টিকাকরণের উপরে আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করিতেই হইবে। দুঃখজনকভাবে কোভিডের টিকাকরণ পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালনা করা সম্ভব হইতেছে না। প্রথম পর্যায়ে প্রায় পৌনে ২ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হইয়াছিল, কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রথম পর্যায়ের প্রথম ধাপে মাত্র ৫২ লক্ষ মানুষকে দিতে পারিয়াছে। মুশকিল হইয়াছে টিকার জোগান লইয়া। ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের সহিত ৩ কোটি টিকা ক্রয়ের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করিয়াছিল সরকার। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে ৫০ লক্ষ টিকা পাইবার কথা। জানুয়ারি মাসে ঠিকমতো চালান আসিলেও ফেব্রুয়ারিতে আসিয়াছে মাত্র ২০ লক্ষ টিকা। অর্থাত্ ফেব্রুয়ারির ৩০ লক্ষ ও মার্চের পুরা ৫০ লক্ষের চালান বাকি পড়িয়াছে। এইদিকে এপ্রিলেরও আর ১১ দিন বাকি রহিয়াছে। ইহা ছাড়াও করোনার টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্স হইতে টিকা পাইবার কথা আছে বটে, কিন্তু উহারও নির্দিষ্ট কোনো সময় জানা যাইতেছে না। কারণ এই টিকাও আসিবে ভারতের সিরাম হইতে। অথচ ভারতেরই টিকা চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রহিয়াছে।
তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হইল, কোভিডের দুইটি টিকা উত্পাদনে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ভারত আরো তিন-চারটি টিকার বিকল্প ব্যবস্থা লইয়াছে। ইতিমধ্যে রাশিয়ার স্পুটনিক ভি তাহারা নিশ্চিত করিয়াছে। তাহা হইলে আমরা কেন একটিমাত্র ভ্যাকসিনের ওপর ভরসা করিয়া অনিশ্চয়তার অন্ধকারে বাস করিব? বাংলাদেশ বসিয়া নাই ঠিকই; কিন্তু পদার্থবিদ্যায় ‘কাজ’-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী সারা দিন দেওয়াল ঠেলিয়া একচুল নড়াইতে না পারিলে উহাকে ‘কাজ’ বলা যাইবে না। সুতরাং আমাদের প্রকৃত ‘কাজ’ করিয়া দেখাইতে হইবে। বাজারটি কিন্তু প্রতিযোগিতার এবং কেহই বসিয়া নাই।