তরুণ সমাজ ও বেকারত্বের অভিশাপ

বেকার বলতে সাধারণত তাদেরকে বোঝানো হয় যারা কর্মক্ষম এবং দেশের যে কোনো কাজ করতে ইচ্ছুক কিন্তু কাজ পায় না। একজন বেকার ছেলে যেন গোটা সমাজের দ্বারা অভিশপ্ত। বেকারদেরকে নিয়ে আলোচনা করার সময় প্রথমে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে সেটা হলো সমাজ এবং পরিবারিক জীবনে তাদের অবস্থান। আমরা যদি বেকার যুবকদের পরিবারের অবস্থানের কথা চিন্তা করি তাহলে সেখানে দেখতে পায় শুধু শূন্যতা। অর্থাত্ এসব বেকারের দিনের শুরুটাই হয় অন্যের এবং পরিবারের সদস্য কর্তৃক ধিক্কার দ্বারা। সমাজের কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত তাদেরকে ধিক্কার প্রদান করে। এখন প্রশ্ন হলো—দেশে বেকার সমস্যা সৃষ্টি হয় কীভাবে? আমরা জানি, আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। আর এই বৃহত্ জনসংখ্যার দিকে তাকালে দেখা যায় তাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষার অভাব, অনেক ক্ষেত্রে তারা কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করে। এছাড়াও অনেক সময় এসব তরুণ নানারকম অনলাইন আসক্তির ফলে সৃজনশীল কিছু চিন্তা করা থেকে বিরত থাকছে, যার ফলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে বেকারের হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশ,  ২০১০ সালে ছিল ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ২০১৯  সালে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং এখানে তরুণদের হার ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। এমন পরিসংখ্যান আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে তা বলে দেয়। এছাড়াও বেকারের দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার আট দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। যেখানে চাকরিতে পদের সংখ্যা রয়েছে ৪ লাখ, সেখানে পদপ্রার্থীর সংখ্যা ২০ লাখেরও বেশি। আমরা যদি গত ৪১তম বিসিএসের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাব যে, সেখানে ক্যাডার দেওয়া হবে মাত্র ২ হাজার ৫০০; কিন্তু এই ক্যাডার পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার। যেটাকে আইসল্যান্ডে দেশের মোট জনসংখ্যার সঙ্গে তুলনা করা যায়। বাংলাদেশের শিক্ষার ক্ষেত্রে দেখা যায়, আধুনিক শিক্ষার অভাব মানে যেখানে বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে এবং প্রযুক্তি জীবনের একটা অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে আমাদের দেশে প্রযুক্তি শিক্ষার প্রতি অনীহা দেখা যায়। বাংলাদেশের আইটি খাতে যে ১৩ লাখ শ্রমিক কাজ করে তাদের অনেকেই অন্য চাকরির পাশাপাশি এই কাজটি করে। অনেক সময় দেখা যায়, চাকরির দক্ষতা থাকার পরেও টাকার অভাবে চাকরি নিতে অপারগ দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণরা। আর এমন অনিয়মের মাধ্যমে দক্ষতার স্থলে অদক্ষ লোক নিয়োগ দেওয়ার ফলে উন্নয়নের জায়গায় অবনতি বেশি সাধিত হচ্ছে। অনেক সময় দেশের শিক্ষিত তরুণরা উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করে, তাদের সবারই চাই সরকারি চাকরি। তাদের এমন চাওয়ার ফলেও বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। পৃথিবীর কোনো দেশই তার নিজ দেশের প্রত্যেক তরুণকে সরকারি চাকরি দিতে সক্ষম নয়। তরুণরা যদি তাদের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে কোনো কিছু উদ্ভব করত তাহলে হয়তো এমন চিত্র বাংলাদেশে বিরাজ করত না। বেকারদের কথা চিন্তা করলেই দেশের শিক্ষিত তরুণদের করুণ চেহারা ভেসে ওঠে, কারণ দেশের প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে ৪৭ জন বেকার। অর্থাত্ দুই জনের মধ্যে একজন বেকার হিসেবে পরিচিত, এমন চিত্র সত্যিই উদ্বেগের বিষয়। কারণ দেশকে যারা আগামীতে নেতৃত্ব প্রদান করবে তারা যদি বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায় তাহলে দেশের এই যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে সেটা কোনো কাজে দেবে না। কারণ যাদের জন্য উন্নয়ন তারাই যদি না থাকে তাহলে সেই উন্নয়ন কতটুকু যুক্তিসংগত হতে পারে! বেকারত্বের অভিশাপ থেকে আমাদের তরুণ সমাজকে রক্ষা করার জন্য চাই মাঠ পর্যায় থেকেই উদ্বোগ। এছাড়া দেশের তরুণ সমাজকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন সহজ এবং স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে যার ফলে দেশের আগামী প্রজন্ম উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে পারে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়