বাগেরহাটে হেফাজতের হামলা ওসিসহ সাত পুলিশ আহত

হেফাজতের নেতা মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেফতারের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হেফাজতের নেতাকর্মীদের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে হেফাজতের কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। গতকাল বাগেরহাটের মোল্লাহাটে হেফাজতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে থানার ওসিসহ পুলিশের সাত সদস্য আহত হয়েছেন। গত রবিবার রাতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় পুলিশকে লক্ষ্য করে হেফাজতের কর্মীরা ককটেল নিক্ষেপ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় কালিয়াকৈর উপজেলা আমিরসহ হেফাজতের তিন নেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নারায়ণগঞ্জে সহিংসতার মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন মহানগর জামায়াতের আমির ও সোনারগাঁও জাতীয় পার্টির সভাপতি। রবিবার কেরানীগঞ্জে পুলিশ ও হেফাজতের কর্মীদের মধ্যে পালটাপালটি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলায় হেফাজতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে মোল্লাহাট থানার ওসি কাজী গোলাম কবিরসহ পুলিশের সাত সদস্য আহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে মোল্লাহাট উপজেলার হাসপাতাল মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বর্তমানে ঐ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত হেফাজতের কোনো নেতাকর্মীকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

মোল্লাহাট থানার ওসি কাজী গোলাম কবির বলেন, হেফাজতের নেতা মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেফতারের প্রতিবাদে উপজেলার বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্ররা মিছিল নিয়ে হাসপাতাল মোড়ে জড়ো হতে থাকেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে হেফাজতের নেতাকর্মীদের জড়ো হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তারা পুলিশের ওপর হামলা করেন।

বাগেরহাট পুলিশ সুপার কে এম আরিফুল হক বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কালিয়াকৈরে ককটেল নিক্ষেপ, উপজেলা আমিরসহ

হেফাজতের তিন নেতা গ্রেফতার

কালিয়াকৈর (গাজীপুর) সংবাদদাতা জানান, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে রবিবার রাতে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করে পালিয়ে যাওয়ার সময় বাংলাদেশ হেফাজত ইসলামের কালিয়াকৈর উপজেলার আমির মুফতি মাওলানা মো. এমদাদুল্লাহ ওরফে এমদাদুল হক, তার সহযোগী মো. আশরাফুল ইসলাম ও মোহাম্মদ আলীকে গ্রেফতার করেছে গাজীপুর জেলা পুলিশ। এ সময় পুলিশ আত্মরক্ষার্থে কয়েক রাউন্ড শটগানের গুলি চালায়। ককটেল বিস্ফোরণে পুলিশের তিন সদস্য আহত হন। আহতদের কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে।

প্রেসরিলিজ ও থানা সূত্রে জানা যায়, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হককে গ্রেফতারের প্রতিবাদে কিছু দুষ্কৃতকারী কালিয়াকৈর থানাধীন চন্দ্রার সিএনজি স্ট্যান্ডে একত্রিত হয়ে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালাতে পারে—এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুর জেলা পুলিশের একটি দল রবিবার রাত ৩টার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার কালামপুর নামক স্থানে উপস্থিত হয়। এ সময় ৩৫-৪০ জন দুষ্কৃতকারী অতর্কিতভাবে পুলিশকে লক্ষ্য করে কয়েকটি ককটেল নিক্ষেপ করে। ককটেল বিস্ফোরণে পুলিশের তিন সদস্য আহত হন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ কয়েক রাউন্ড শটগানের গুলি করে। তখন দুষ্কৃতিকারীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় ঘটনাস্থল থেকে  মুফতি মাওলানা এমদাদুল হকসহ তিন জনকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে কালিয়াকৈর থানায় মামলা রুজু করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন থানার ওসি মো. মনোয়ার হোসেন চৌধুরী।

সোনারগাঁওয়ে না.গঞ্জ মহানগর জামায়াতের আমির ও

জাতীয় পার্টির সভাপতি আব্দুর রউফ গ্রেফতার

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ ও সোনারগাঁও সংবাদদাতা জানান, গত ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে রয়েল রিসোর্টে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হক নারীসহ অবরুদ্ধের ঘটনার পর সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মামলায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা মাঈনুদ্দিন আহমেদ ও সোনারগাঁও উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আব্দুর রউফকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আব্দুর রউফ উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও। এর আগে তিনি উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ছিলেন। গতকাল সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে শম্ভুপুরা ইউনিয়ন পরিষদে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানান সোনারগাঁও থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান। হেফাজতের সহিংসতায় ছাত্রলীগের নেতার বাড়িতে ভাঙচুর করার ঘটনায় উপজেলা যুবলীগের প্রচার সম্পাদক নাসির উদ্দীনের দায়ের করা মামলায় আব্দুর রউফকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃত আব্দুর রউফকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে নারায়ণগঞ্জ আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা মাঈনুদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয় গত রবিবার রাতে। একই সময়ে গ্রেফতার করা হয় জামায়াতের সদস্য জনি ও বিএনপির নেতা ইসলামকে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী জানান, রাতে গ্রেফতারের পর আসামিদের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় নেওয়া হয়। সকালে তাদের আদালতে পাঠানো হয়। গ্রেফতারকৃত তিন জনই হেফাজতের হরতালে নাশকতা সৃষ্টির ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।

উল্লেখ্য, গত ৩ এপ্রিল রয়েল রিসোর্ট, আওয়ামী লীগ অফিস ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর এবং মহাসড়কে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দুটি এবং ক্ষতিগ্রস্তরা বাদী হয়ে পাঁচটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৪৪৬ জনের নাম উল্লেখ করে ১ হাজার ৮০০ জনকে আসামি করা হয়। এ পর্যন্ত ৭ মামলায় পুলিশ ৬৫ জনকে গ্রেফতার করেছে।

কেরানীগঞ্জে পুলিশ ও হেফাজতের কর্মীদের মধ্যে পালটাপালটি ধাওয়া

কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, রবিবার দুপুরে ঢাকার কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন মান্দাইল এলাকায় পুলিশ ও হেফাজতের কর্মীদের মধ্যে পালটাপালটি ধাওয়া হয়েছে। এ সময় হেফাজতের কর্মীদের ইট-পাটকেলের আঘাতে ৩ পুলিশ সদস্য আহত হন। এছাড়া ১জন পথচারীও আহত হন। রবিবার দুপুর আড়াইটার দিকে জিঞ্জিরা ইউনিয়নের মান্দাইল জামিয়াতুল মাদ্রাসা ও এর আশপাশে থেকে হেফাজতের শতাধিক নেতাকর্মী জড়ো হয়ে মিছিল বের করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে মামুন নামে হেফাজতের এক কর্মীকে আটক করা হয়।

মামুনুলের মুক্তির দাবিতে গফরগাঁওয়ে জঙ্গি মিছিল

নেতৃত্বে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হুজির শীর্ষ নেতার দুই ছেলে

গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেফতারের প্রতিবাদে এবং তার মুক্তির দাবিতে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে জঙ্গি মিছিল হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় উপজেলার বারবাড়িয়া ইউনিয়নের লক্ষ্মণপুর গ্রামে এই জঙ্গি মিছিলের নেতৃত্ব দেয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা ও পরিকল্পনাকারী, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হুজির আধ্যাত্মিক নেতা মাওলানা আবু জাফর ওরফে আবু সাঈদ ওরফে বাচ্চু মৌলভীর দুই ছেলে সাদ (২২) ও জিসান (১৭)। জঙ্গি মিছিলটি বাচ্চু মৌলভির প্রতিষ্ঠিত লক্ষ্মণপুর নূরানিয়া মাদ্রাসার সামনে থেকে বের হয়ে লক্ষ্মণপুর গ্রামের বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে। মিছিল থেকে মামুনুল হকের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন উগ্রবাদি স্লোগান দেওয়া হয়। এ সময় এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানান, মিছিলে বারবাড়িয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক বজলুর রশীদসহ শতাধিক লোক অংশ নেন। এই জঙ্গি মিছিলের খবর পেয়ে গফরগাঁও থানার পুলিশ লক্ষ্মণপুর গ্রামে অভিযান চালালেও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।