ভারতে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ, দিল্লিতে ছয় দিনের লকডাউন

ভারতে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। হাসপাতালের বেড পূর্ণ হয়ে গেছে। সংকট দেখা দিয়েছে অক্সিজেনের। শিল্পকারখানায় অক্সিজেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাওয়া যাচ্ছে না ওষুধও। টিকার সংকট দেখা দেওয়ায় উত্পাদন প্রতিষ্ঠানকে কোটি কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হচ্ছে। দিল্লিতে ছয় দিনের লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত সফর বাতিল করেছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। খবর ডয়চেভেলে ও আনন্দবাজার পত্রিকার

শ্মশান ও কবরস্থানে ভিড়

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে এরই মধ্যে পালটে দিয়েছে যাবতীয় হিসাবনিকাশ। ভারতে দৈনিক আক্রান্ত আড়াই লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৮১০ জন যা রবিবারের থেকে প্রায় ১২ হাজার বেশি। সংক্রমণের সঙ্গে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে বেড়েছে দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যাও। ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে মারা গেছে ১ হাজার ৬১৯ জন। এক দিনে মৃত্যুর নিরিখে গোটা করোনা পর্বে যা সর্বোচ্চ।

একটানা পাঁচ দিন ধরে ২ লাখের বেশি নতুন সংক্রমণের জেরে ভারতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দেড় কোটি ছাড়িয়ে গেছে। মোট মৃত্যুও ১ লাখ ৭৮ হাজার ছাড়িয়েছে। এই সংক্রমণ বৃদ্ধিতে দেশটিতে বাড়ছে সক্রিয় রোগীর সংখ্যা। ২৪ ঘণ্টায় সক্রিয় রোগী বেড়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ১৩ জন। এতো সক্রিয় রোগী দেশটিতে আগে দেখা যায়নি। রোগী বৃদ্ধির জেরে হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলোতে শয্যা প্রায় আর খালি নেই। একই শয্যায় দুই জন রোগী শুয়ে থাকার দৃশ্য দেখা গেছে বেশ কয়েকটি রাজ্যে। এমনকি অক্সিজেন না পেয়ে    কোভিড রোগীর মৃত্যুর খবর আসছে। দৈনিক মৃত্যু এই পর্যায়ে চলে যাওয়ায় হাসপাতালে মর্গের বাইরে, শ্মশানে এবং কবরস্থানে মৃতদেহের সারি পড়ে থাকছে।

দিল্লিতে ছয় দিনের লকডাউন

প্রতিটি রাজ্যেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। শীর্ষে মহারাষ্ট্র। সেখানে ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ৬৮ হাজারের বেশি মানুষ। রাজধানী দিল্লির অবস্থাও বেশ খারাপ। সেখানে এক দিনে আক্রান্ত ২৫ হাজার ৪৬২ জন। তারপর দিল্লিতে আগামী সোমবার পর্যন্ত লকডাউন ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। দিল্লিতে প্রথমে ছয় দিনের কারফিউ জারির ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে কেজরিওয়াল জানান, ছয় দিন লকডাউনে থাকবে দিল্লি। এছাড়া উত্তরপ্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু প্রতিটি রাজ্যেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা প্রবলভাবে বাড়ছে।

পাওয়া যাচ্ছে না অক্সিজেন

সব চেয়ে বড় কথা, প্রতিটি রাজ্যেই অক্সিজেনের অভাব দেখা দিয়েছে। মহারাষ্ট্র বারবার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অক্সিজেন চাইছে। কেজরিওয়ালও জানিয়েছেন, অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিটি রাজ্য থেকে একই রিপোর্ট আসছে। তারপর সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ২২ এপ্রিল থেকে শিল্পক্ষেত্রে অক্সিজেন ব্যবহার করা যাবে না। সেই অক্সিজেন হাসপাতালে সরবরাহ করা হবে। তবে ওষুধ ও পরমাণু চুল্লির মতো ৯টি জরুরি জায়গায় আগের মতোই অক্সিজেন ব্যবহার করা যাবে।

পাওয়া যাচ্ছে না ওষুধও

জীবনদায়ী ওষুধেরও সংকট দেখা দিয়েছে। সব হাসপাতালের আইসিইউ পূর্ণ। এই অবস্থায় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার হাসপাতালগুলো সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হবে। সেগুলোকে পুরোপুরি করোনার চিকিত্সার জন্য ব্যবহার করা হবে। তাতে অসুবিধা থাকলে একটা বড় অংশে করোনা রোগীদের চিকিত্সা হবে। করোনা রোগীদের অনেক হাসপাতালে রেমডেসিভির দেওয়া হয়। কিন্তু সেই ইঞ্জেকশনও পাওয়া যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে অনেক রাজ্যই সমানে তা চাইছে। এর মধ্যে মহারাষ্ট্রে প্রচুর পরিমাণ রেমডেসিভির উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে তারপরই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী থানায় হাজির হয়ে বলেন, এটা দলীয় স্তরে সংগ্রহ করে পাঠানো হচ্ছিল।

তারপরও লকডাউন নয়

এবার ভারত সরকার লকডাউন বা কোনো কড়াকড়ির কথা ঘোষণা করছে না। তারা রাজ্যগুলোকে বলছে, কড়া ব্যবস্থা নিতে। প্রায় প্রতিটি রাজ্যই এখন রাতে কারফিউ জারি করছে। বিহার, রাজস্থান, তামিলনাড়ু সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সব স্কুল, সিনেমা হল, ধর্মস্থান ও শপিংমল বন্ধ থাকবে। রাজস্থানও ৩ মে পর্যন্ত লকডাউনের ঘোষণা করেছে। রাজ্যগুলোর আশঙ্কা, করোনা সংকট আরো বাড়িয়ে দিতে পারেন কুম্ভমেলা ফেরত মানুষ। মহারাষ্ট্র সরকার এরই মধ্যে এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। অন্য রাজ্যও চিন্তিত।

বরিস জনসনের সফর বাতিল

চলতি মাসের শেষে তিন দিনের ভারত সফরে আসার কথা ছিল ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের। করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকার কারণে সফরসূচি কাটছাঁট করে কেবলমাত্র ২৬ এপ্রিল সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল। কিন্তু ব্রিটেনের প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির পাশাপাশি ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির একাংশের পক্ষেও করোনা পরিস্থিতির কারণে বরিসের ভারত সফর নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। এরপর ব্রিটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সফর বাতিল করা হয়েছে।