আমরা সবাই নিজেকে ‘বড়’ কিছু ভাবতে ভালোবাসি। আমরা আসলে এক-একটা কুয়োর ব্যাং। আমরা যখন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করি, মনে করি এটাই পৃথিবীর ব্যস্ততম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, আর সবকিছু ফালতু। ধরা যাক, একজন বিসিএস দিয়ে ফরেন ক্যাডার হলেন, তিনি হয়তো ভাবছেন—তিনি সবার থেকে ভালো করেছেন।
ধরা যাক, আরেক জন দেশের শ্রেষ্ঠ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করলেন। তাকে যদি জিগ্যেস করা যায়, বিসিএস দেবেন কি না, তিনি হয়তো বিসিএসকে পাত্তাই দেবেন না। বলবেন, ‘বিসিএসই যদি দিতে হয় তাহলে এত কষ্ট করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লাম কেন?’ আবার ধরেন, একজন জজ হয়েছেন। তিনি হয়তো ভাবছেন—‘আমিই পৃথিবীর সেরা চাকরিজীবী।
সাবেক কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও যদি মামলা হয়, তবে আমার কোর্টে আমাকে স্যার বলতে হবে।’ আবার তিনি যদি জজের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে অধ্যাপনার পেশায় আসেন তিনি তখন ভাববেন, নিজে জজ হওয়ার চাইতে জজ বানানোটাই বেশি সম্মানের। আবার যারা ব্যবসায়ী তারা মনে করেন, চাকরিজীবীরা হচ্ছে চাকর। ঐ পেশায় কোনো স্বাধীনতা নেই। দেশের অর্থনীতিতে আমাদের অবদানই বেশি। আমাদের কাউকে স্যার বলতে হয় না।
তাহলে প্রশ্ন হলো, সেরাটা কে? আরো বড় প্রশ্ন হলো, সেরা কেন হতেই হবে? সেরা কেন ভাবতেই হবে? ফেসবুকে এ নিয়ে একটি পোস্ট পেলাম। কয়েক বছর আগে একদিন এক শিক্ষার্থী তার প্রফেসরকে জিগ্যেস করলেন, ‘স্যার, ক্যাডারদের মধ্যে কোন ক্যাডার হওয়াটা বেশি সম্মানের?’ প্রফেসর বললেন, ‘সম্মান যে কার বেশি, এটা বলা খুব মুশকিল। পদমর্যাদার দিকে একজন সচিব একজন ডাক্তারের থেকে ওপরে। আবার ঐ সচিবের ছেলেটা যখন ইন্টার পাশ করবে, তখন সচিবও চায় তার ছেলে যেন ডাক্তারিতে চান্স পায়।’
এগুলো হলো আমাদের সোশ্যাল পারসেপশন বা সামাজিক বোধ। এই বোধের মধ্যে কতখানি ভেজাল আছে, সেটা আমি বিদেশে না গেলে এত স্পষ্ট করে বুঝতে পারতাম না। জাপানে চিকিত্সাবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার জন্য পাসপোর্ট করার সময় আমার নামের আগে ‘ডা.’ লাগিয়ে দিলাম। তখন ‘হাতে-লেখা’ পাসপোর্ট ছিল বলে এটা সম্ভব ছিল। আমার ধারণা ছিল, ইমিগ্রেশনের সময় ইমিগ্রেশন অফিসার আমার ‘ডাক্তার’ পরিচয় পেলে কম ঝামেলা করবেন। এরপর যখন জাপানে এলাম, দেখি, সেখানকার ডাক্তার বা প্রফেসর কেউই প্রথম পরিচয়ের সময়ই কখনো নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে নামের আগে ডা. বা অন্য কিছু উল্লেখ করেন না। আমি তো পড়ে গেলাম মহা লজ্জায়।
সত্যিকার অর্থে পাসপোর্টে আমার নিজের নাম নিয়ে আমি একরকম বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ে গেলাম। লজ্জা থেকে বাঁচতে ঠিক করলাম আমার পাসপোর্টের নাম সংশোধন করব। টোকিওর দূতাবাসের এক কর্মকর্তাকে ফোন করলাম। সব শুনে তিনি বললেন, কিছুদিন পরে তো আমার এমনিতেই নতুন পাসপোর্ট করতে হবে, তখন না হয় ‘ডা.’ অংশটা বাদ দেওয়া যাবে। এজন্য এখন তো ৪ হাজার ইয়েন খরচ করার দরকার নাই। আমি বললাম, আমি যে নিজে একটা বলদের মতো কাজ করেছি তার জন্য এই ৪ হাজার ইয়েন আক্কেল সেলামি দিতে চাই। তিনি হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে, টাকাসহ পাসপোর্ট পাঠিয়ে দেন, আমরা ঠিক করে দিব।’ ৪ হাজার ইয়েন আক্কেল সেলামি দিয়ে আমি নাম সংশোধন করেছিলাম সেবার। তার কিছু দিন পরে দেখলাম সরকার থেকেই নিয়ম করা হলো, পাসপোর্টে নামের আগে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বা মিস্টার জাতীয় কোনো কিছু ব্যবহার করা যাবে না।
আরেকটু পেছনে ফিরে দেখা যাক। যখন মেডিক্যালে চান্স পেয়েছিলাম তখন সাদা অ্যাপ্রোন নিয়ে উত্তেজনা ছিল চরমে! ক্লাস শুরুর সপ্তাহ কয়েকের মধ্যে সেই উত্তেজনা শেষ হয়ে গেল। অ্যাপ্রোন গা থেকে ঘাড়ে উঠল। তবে যখন রিকশা করে সদর রোডে ঘুরতে যেতাম তখন কিন্তু অ্যাপ্রোন ঠিকই সঙ্গে থাকত। গায়ে কিংবা ঘাড়ে নয়, ব্যাগের ভেতর। তবে ব্যাগের কোনা দিয়ে অ্যাপ্রোনটা ঠিকই দেখা যেত। অল্প দিনের মধ্যেই অ্যাপ্রোন তার ব্যবহারের মূল কারণ বাদ দিয়ে ভাবটাব নেওয়ার অস্ত্রে পরিণত হলো আর কি। বিদেশে আসার পর দেখলাম খালি ডাক্তার নন, ডিপার্টমেন্টের নন-মেডিক্যাল স্টাফও অ্যাপ্রোন পরে। ল্যাব-স্টাফও পরে, গবেষকও পরেন। এমনকি আমি কিচেনের স্টাফকেও সাদা অ্যাপ্রোন পরে কাজ করতে দেখেছি।
আমাদের পরিবারে, মানে আপন ভাইবোন ও আপন কাজিনদের মধ্যে শিক্ষক, আইনজীবী, কৃষক, রাজনীতিবিদ, পুলিশ, প্রশাসন, চিকিত্সক, ব্যাংকার— সব পেশার লোক আছে, ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া। আমাদের নিজেদের মধ্যে পেশাগত এই ডাইভারসিটির জন্য নিজেকে খুব সৌভাগ্যমান বলে মনে হয়। অন্য পেশার ভেতরের ইমপালসটা পুরোপুরি না হলেও আমি কিছুটা অনুধাবন করতে পারি। নিজে যেমন আঠারো ঘণ্টার নাইট ডিউটি করেছি, তেমনি বুট পরে আঠারো ঘণ্টার ডিউটির পরের দিনই আবার কোনো পুলিশকে ডিউটিতে আসতে দেখেছি। সেদিন আমার যে কাজিনটা অ্যাডমিনে আছে, ও বলছিল, ‘বড় ভাইয়া দেইখো, আমি কিন্তু অন্য কোনো পেশার কারো সাথে কথা বলতে গিয়ে উত্তেজিত হব না।’
বরিশালের ভুরঘাটা হতে শুরু করে এঘাট-ওঘাট ঘুরেফিরে আমি এখন যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানার শ্রিভ পোর্টে। পৃথিবীর তিনটা দেশে থাকার সুবাদে আমি এটুকু বুঝেছি, কথাবার্তায় চালচলনে আমাদের বিনয়ী হতেই হবে। অন্যের প্রতি, অন্য পেশার প্রতি শ্রদ্ধা রাখতেই হবে। এখানে উল্লেখ্য, আমি এখন আমার বসকে নাম ধরে ডাকলেও ক্লিনারকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করি। আমার বাবা, চাচা, নয়া-দাদা স্বাধীনতাসংগ্রামে অংশ নিয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক সম্মানিত করেছেন। যারা বাংলার স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন তাদের নিয়ে কেউ কটাক্ষমূলক কথা বলুক, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তেমনি কায়োমনে আমি প্রার্থনা করি, যে কোনো দুর্বল মুহূর্তে আমার দ্বারা এমন কোনো দাম্ভিকতা যেন না প্রকাশ পায়, যাতে আমার পূর্বপুরুষদের অবদান নিয়ে অন্যরা মজা করা সুযোগ পায়।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিৎসক
ইত্তেফাক/জেডএইচডি