অহংবোধ হইতে মুক্ত থাকিতে হইবে

গত ১৮ এপ্রিল রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে এক নারী চিকিত্সকের নিকট তাহার আইডি কার্ড কিংবা মুভমেন্ট পাশ আছে কি না—তাহা প্রদর্শন করাকে কেন্দ্র করিয়া বাগিবতণ্ডায় লিপ্ত হন ঐ চিকিত্সক এবং দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তা। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হইলে সর্বত্র ইহা লইয়া আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠে। চিকিত্সক ও পুলিশের নিজ নিজ পেশাগত সংগঠন পত্রিকায় বিবৃতি দিয়া একে অপরের মুখামুখি দাঁড়াইয়া যায়। বিষয়টি কোর্ট-কাচারি পর্যন্ত গড়ায়। শুধু চিকিত্সক নহে, লকডাউন চলাকালে আইনজীবীসহ সাধারণ মানুষের সহিতও একই ব্যাপারে পুলিশের বাদানুবাদের ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে গালিগালাজের পাশাপাশি ধাক্কাধাক্কি এমনকি প্রিজন ভ্যানে তুলিয়া নেওয়ার নজিরও তৈরি হইয়াছে। সংশ্লিষ্ট সকলে নিজ নিজ পেশার মহত্ত্ব প্রকাশ করিয়াছেন। কাহারো কাহারো ভাষায় ছিল মারাত্মক অহমিকাবোধও। পেশাজীবীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব হইলে তাহার পরিণাম কখনো শুভ হইতে পারে না। আমরা আশা করি, শীঘ্রই এই ব্যাপারে সকল ভুল বুঝাবুঝির অবসান হইবে।

এখন চলিতেছে পবিত্র মাহে রমজান। এই মাসের প্রধান শিক্ষাই হইল সংযমী হওয়া। আমাদের কথা ও কাজে ইহার পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। ইগো বা অহংকার লইয়া তর্ক করা যায় না। তর্ক করিতে হয় যুক্তি দিয়া। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নারী চিকিত্সক পুলিশের সহিত তর্কবিতর্কে লিপ্ত হন, তিনি অ্যাপ্রোন পরিহিতা ছিলেন। তাহার পোশাকে থাকা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামও ছিল। আর চিকিত্সকগণ করোনা মহামারি মোকাবিলার ফ্রন্টলাইনার তথা সম্মুখসারির যোদ্ধা। তাহাদের চলাচল এমনিতেই লকডাউনের আওতামুক্ত। তদুপরি একজন নারী চিকিত্সকের সহিত ভালো ব্যবহার করাই কাম্য ছিল। আইডি কার্ড দেখিবার নামে বাড়াবাড়ি করা উচিত হয় নাই। পক্ষান্তরে সেই নারী চিকিত্সকেরও উচিত ছিল পুলিশকে তাহার দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা প্রদান করা। আইডি কার্ড কোনো কারণে আনিতে ভুলিয়া গেলে তাহার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা; কিন্তু আমরা ফেসবুকের কল্যাণে দুই পেশার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে বাগিবতণ্ডার যে চিত্র দেখিলাম তাহা অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনকও বটে।

আমরা ইহার পূর্বেও বলিয়াছি, করোনা মহাদুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের পুলিশি ভূমিকায় অবতীর্ণ হইবার দরকার নাই। সরকারের মূল কাজ হইল জনগণকে সচেতন করা এবং করোনা বিপর্যয়ের সঠিক চিত্র তুলিয়া ধরা। ইহার চিকিত্সাগত সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা। ইহা সত্ত্বেও যাহারা জানিয়া-শুনিয়া বিষ পান করিবেন, তাহাদের দায়দায়িত্ব সরকার নিবে কেন? বলা হইতেছে চিকিত্সক, আইনজীবী ও পুলিশ—এই সকল পেশার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এখানে ক্ষমতার দাপট দেখাইয়াছেন। তবে চিকিত্সক ও আইনজীবীর বেলায় তর্ক করিবার সাহসকে ক্ষমতার দাপট না বলিয়া বলা যায় সেল্ফ কনফিডেন্স বা আত্মবিশ্বাস। অথবা তাহাদের মধ্যেও অহংবোধ কাজ করিয়া থাকিতে পারে। তবে আমাদের জানিয়া রাখা উচিত, আল্লাহ তায়ালা কোনো উদ্ধত ব্যক্তি ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না। অহংকার পতনের মূল কারণ। অহংকার করা কেবল সৃষ্টিকর্তাকেই মানায়। আমাদের আরো জানিয়া রাখা উচিত, দুনিয়ার বিচারই শেষ বিচার নহে, আরো বিচার আছে। সুতরাং আমাদের সকল প্রকার অহংবোধ হইতে মুক্ত থাকিতে হইবে। বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ পরস্পরের উপর নির্ভরশীল ও একে অপরের পরিপূরক বিধায় কাহাকেও খাটো করিয়া দেখিবার অবকাশ নাই।