চিকিত্সাসেবায় প্রয়োজন বিশেষ গুরুত্বারোপ

বিশ্বমারি করোনা ভাইরাসের কবলে ছোট-বড় সব দেশের মতো আমাদের দেশের অর্থনীতিও পর্যুদস্ত। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির আমদানি ও দেশীয় পণ্য রপ্তানিতে ভাটা পড়ায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাতে ক্রমাগত ক্ষতিতে এ সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। আকস্মিক এ দুর্যোগে কোনো জাতিগোষ্ঠীর প্রস্তুতি না থাকলেও তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা রাষ্ট্রগুলোর অবস্থা শোচনীয়।

শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক দক্ষতায় প্রভূত সাফল্য অর্জন করলেও বাংলাদেশের পুষ্টি পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয় বলে দাবি বিশ্বের স্বাস্থ্যসেবায় নীতিনির্ধারণী সংস্থাগুলোর। সুস্থ ও স্বাভাবিক গর্ভধারণ, নবজাতকের সুস্বাস্থ্য ও শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে আছে অনেকটাই।

লন্ডনের ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত ভারতীয় বংশোদ্ভূত চিকিত্সক অসীম মালহোত্রা জানান যে, সারা বিশ্বে চলমান করোনায় মৃত্যুর প্রধান কারণ অপুষ্টি। সেই সঙ্গে আমাদের দেশে ব্যাপক অপুষ্টিজনিত সমস্যা ও আগে থেকে প্রভাব বিস্তার করা অসংক্রামক রোগগুলো চলমান মহামারির সময়ে উঠেছে মাথাচাড়া দিয়ে। বর্তমানে এসব রোগের প্রাদুর্ভাব প্রায় ৬১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্য অনুযায়ী, যেসব করোনা রোগীর অন্য কোনো শারীরিক অসুস্থতা নেই তাদের মৃত্যুর হার মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। তাই জনগণের সুস্বাস্থ্যের বিষয়টি নিশ্চিতে ভবিষ্যত্ মহামারি থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ মিলবে।

আবার স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত সম্মুখ ভাগের যোদ্ধাদের নিরাপত্তায় উদাসীনতায় জাতি হারিয়েছে অনেক মেধাবী ও দেশবরেণ্য চিকিত্সককে। সেই সঙ্গে অন্য সাধারণ রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সা না পেয়ে করুণ মৃত্যুর সংখ্যাও এ মহামারিকালে নিতান্ত কম নয়।

এসব ভুল থেকে পরবর্তী মহামারির জন্য আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। কারণ এ মহামারিই শেষ নয়। অতীত ইতিহাস দেখলে আমরা দেখতে পাই, প্রতি শতকে এ পৃথিবীতে কোনো না কোনো মহামারি এসেছে। মহামারিগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ভারতবর্ষ স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে সব সময়ই পিছিয়ে।

সেকারণেই ইউরোপ কিংবা আমেরিকা থেকে উত্পত্তি হওয়া মহামারিতেও বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ উপমহাদেশ। যেসব দেশ মহামারি থেকে শিক্ষা নিয়েছে তাদের অবস্থা অন্যদের চেয়ে মোটামুটি ভালো।

প্রতি বছরই ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করলেও নাজুক অবস্থা কাটেনি আমাদের দেশের স্বাস্থ্যসেবায়। বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের মতে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ১৯৮২ সালে প্রণীত ওষুধ নীতিতে ক্ষতিকর, মূল্যহীন ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বাজার থেকে অপসারণ করা এবং স্বাস্থ্যসেবার সব স্তরে প্রয়োজনীয় ওষুধ ন্যায্য মূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।

জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জরিপ ২০১৮ অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়েও বেহাল দশায় আমাদের এ গুরুত্বপূর্ণ খাতটি। ফলে ওষুধ নীতিতে উল্লেখিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন পূর্ণতা পায়নি।

উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে কার্যকরী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে। এজন্য সরকারের সবগুলো অঙ্গসংগঠনের সমন্বয় সাধন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এ মহামারিতে আলোর দিশা হবে। সেই সঙ্গে এসব নীতির যথার্থ প্রয়োগে স্বাস্থ্য খাতে সমৃদ্ধি আনা সম্ভব। প্রান্তিক মানুষের মধ্যে স্বল্প মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহ সম্ভব হলে সুস্থ জনসম্পদে গতিশীল হবে অর্থনীতির চাকা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়