কারখানা ও গৃহস্থালি বর্জ্যের শেষ গন্তব্য শীতলক্ষ্যা

কালচে পানি, বাতাসে উত্কট গন্ধ

হাবিবুর রহমান বাদল, নারায়ণগঞ্জ

বর্ষা মৌসুমে শীতলক্ষ্যার পানি কিছুটা স্বচ্ছ হলেও পরে  আবার হয়ে ওঠে কালো। তীরে দাঁড়ালেই বাতাসে ভেসে আসে উত্কট গন্ধ। আশপাশের বিভিন্ন কারখানা ও গৃহস্থালি বর্জ্যের কারণে দূষণে  শীতলক্ষ্যা এখন মৃতপ্রায়। গত কয়েকদিন সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বহুমুখী উদ্যোগে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। আশপাশের বিভিন্ন কলকারখানার বর্জ্যমিশ্রিত পানি সরাসরি এসে পড়ছে শীতলক্ষ্যায়। গৃহস্থালি বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে নদীতে। নর্দমাও সংযুক্ত করা হয়েছে নদীর সঙ্গে। পানি নর্দমার মাধ্যমে এসে পড়ছে শীতলক্ষ্যারই বুকে। এ ছাড়া বিভিন্ন নৌযান থেকে ফেলা হচ্ছে প্লাস্টিক ও পলিথিন। ধীরে ধীরে গোটা নদীই যেন তৈরি হয়েছে খোলা নর্দমায়।

শীতলক্ষ্যার  তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। দুই পারে সারি সারি বহুতল ভবন, শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আর এ সব কারখানা ও প্রতিষ্ঠান থেকে নির্গত হচ্ছে তরল ও কঠিন বর্জ্য। আর এর শেষ স্থান শীতলক্ষ্যা। বর্জ্য মিশ্রিত কালো পানির ওপর দিয়ে নৌযান চললেই তৈরি হয় সাদা ফেনা। প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জ শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য এই শীতলক্ষ্যা নদীকে কেন্দ্র করেই খ্যাতি লাভ করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে ভ্রমণের একমাত্র পথ ছিল নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর। এ জন্য নারায়ণগঞ্জকে বাংলা ভ্রমণের প্রবেশদ্বার বলা হতো। এখনো এই নদীর ওপর নির্ভর কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা। কিন্তু কিংবদন্তির সেই স্বচ্ছ সলিলার পানি এখন শিল্পবর্জ্যে কৃষ্ণ বর্ণ।

শীতলক্ষ্যার বেশ কয়েকটি জায়গায় দেখা গেল, নোংরা কালো পানিতে গোসল করছেন লোকজন। কেউ কেউ কাপড় ধোয়ার কাজও সারেন এই পানিতেই। নোংরা পানিতে কাপড় ধোয়ার কারণ জানতে চাইলে এক নারী বলেন, ‘ঠেকায় পড়ে করতে হয়। বাসায় অনেক সময় পানি থাকে না।’ কাপড় দিয়ে দুর্গন্ধ আসে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কিছুটা গন্ধ তো আহেই, হালকা খলাইয়া লইয়া যাই, বাড়িতে গিয়া আবার খলাই।’ নোংরা পানিতেই গোসলরত একজন জানান, আরো অনেকেই গোসল করে এই পানিতে। বর্ষায় আরো বেশি লোক গোসল করে। রোগবালাই হয় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হয়, মাঝে মাঝেই চুলকানি হয়।’

নদীর পাড়ের এক বাসিন্দা  বলেন, ‘এক সময় রোগ সারলে শীতলক্ষ্যায় গোসল করাইত। রোগ থেকে মুক্তি পাইছে সেই খুশিতে। আর এখন এই পানিতে আজ গোসল করলে কালই বিভিন্ন রোগে ভুগতে হইব।’ কর্মব্যস্ত শহরে প্রতিদিন নৌকায় করে নদী পাড়ি দিতে হয় হাজার হাজার মানুষকে। দুই পাড়ের কর্মজীবী মানুষ দুইবেলা নদী পাড়ি দেন নাক চেপে। নাকে রুমাল চেপে নৌকা থেকে নেমে আসা এক হোসিয়ারি শ্রমিক বলেন, ‘কী আর করার। জীবিকার তাগিতেই আমাদের নদী পার হতে হয়। দুর্গন্ধের কারণে দম বন্ধ হয়ে আসে। নাকে কাপড় কিংবা রুমাল ধরে দুই বেলা পার হই।’ নদী তীরের মানুষেরা বলেন, শীতলক্ষ্যার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা কারখানার বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই নদীতে ফেলার ফলে দূষণ তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অবহেলা তো আছেই। শহরসহ শহরতলীর অধিকাংশ ড্রেন ও ক্যানেলের শেষ গন্তব্য শীতলক্ষ্যায়। এ সব ড্রেন ও ক্যানেল দিয়ে বর্জ্য সোজা মিশে যাচ্ছে নদীর সঙ্গে। এ ছাড়া নদীর পাড়ে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আড়তের আবর্জনার স্তূপ। নারায়ণগঞ্জের সেন্ট্রাল ঘাটসংলগ্ন ওয়াকওয়ের সন্নিকটে গেলেই দেখা যায় শীতলক্ষ্যা দূষণের এমন ভয়াবহ চিত্র।