‘এত বেশি কথা বলো কেন? চুপ করো/ শব্দহীন হও/ শষ্পমূলে ঘিরে রাখো আদরের সম্পূর্ণ মর্মর/ লেখো আয়ু লেখো আয়ু...।’ আয়ু লেখার কথা বলে সবাইকে শব্দহীন করে অনন্তলোকের পথে পাড়ি জমালেন এই সময়ের ‘কবিতার অভিভাবক’ কবি শঙ্খ ঘোষ। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জীবনানন্দ দাশের পর বাংলা কবিতা যাদের হাত ধরে এগিয়েছে, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন। এবার তাকেও কেড়ে নিল করোনা ভাইরাস। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলার কবিতার একটি যুগের অবসান হলো। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কলকাতার উল্টোডাঙার বাসায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বিকালেই নিমতলায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় তার।
প্রেম, প্রতিবাদ অনায়াস ভঙ্গিতে তার কবিতা এমন ঋজু ও বলিষ্ঠ ভাষায় মূর্ত হয়ে ওঠে যে, প্রতিটি বাঙালি সেই কবিতার পঙিক্ততে নিজের মনের আকুতি খুঁজে পান। তার কবিতার পঙিক্তমালা মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তরুণ কবিদের কাছে শঙ্খ ঘোষ যেন শিক্ষকের মতো, প্রেরণা হয়ে বিরাজ করেন।
রবীন্দ্র ও জীবনানন্দের বলয়ের বাইরে গিয়ে বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র ভাষার অন্বেষণে যে তরুণ কবিরা কৃত্তিবাস ও শতভিষা পত্রিকাকে অবলম্বন করে বেড়ে উঠেছিলেন, শঙ্খ ঘোষ তাদের একজন। শক্তি, সুনীল, শঙ্খ, উত্পল, বিনয়—এই পাঁচ কবিকে বলা হতো জীবনানন্দ-পরবর্তী বাংলা কবিতার পঞ্চপাণ্ডব। শঙ্খ ঘোষ ছিলেন একাধারে কবি, কথাশিল্পী, রবীন্দ্র গবেষক, সাহিত্য সমালোচক ও শিক্ষক।
কবি শঙ্খ ঘোষের মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় শঙ্খ ঘোষকে অন্তিম শ্রদ্ধা জানিয়ে পোস্ট দিয়েছেন বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকেরা। রবীন্দ্র গবেষক সৈয়দ আকরম হোসেন লিখেছেন, ‘প্রলোভন-নিরাসক্ত, নীতি ও মেরুদণ্ড-সমৃদ্ধ কবি-গবেষক-শিক্ষক শঙ্খ ঘোষ, আপনাকে জানাই পরম শ্রদ্ধা।’ কবিকে অন্তিম শ্রদ্ধা জানিয়ে পোস্ট দিয়েছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। মুক্তিযোদ্ধা-কবি নাসির উদ্দিন ইউসুফ লিখেছেন, ‘কালের শঙ্খ, তবে বিদায়। আজীবন আপনাকে অনুসরণ করবে আগামী প্রজন্ম।’ সাহিত্যিক মাসুদুজ্জামান লিখেছেন, ‘শঙ্খ ঘোষ সমকালীন বাংলা কবিতার শীর্ষ কবি। উজ্জ্বল, দ্যুতিময় তাঁর কবিতা।’ তরুণ সাহিত্যিক মোজাফফর হোসেন লিখেছেন, ‘একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।’
সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘তিনি আসলে সাহিত্যের অভিভাবক ছিলেন। শঙ্খদাকে শুধু কবি বললে ব্যাপারটা একপেশে হয়ে যায়।’ কবি জয় গোস্বামী লিখেছেন, ‘বাংলা সাহিত্যজগতে মহাবটবৃক্ষের পতন ঘটল। তরুণ কবি এবং লেখকদের মাথার ওপর পিতা এবং অভিভাবকস্বরূপ বিরাজ করছিলেন উনি। নিঃস্ব হলাম।’
গায়ে জ্বর থাকায় গত সপ্তাহে করোনা পরীক্ষা করিয়েছিলেন কবি। ১৪ এপ্রিল বিকেলে রিপোর্ট এলে জানা যায়, তিনি সংক্রমিত হয়েছেন। এমনিতেই বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন কবি, যা শারীরিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল তাকে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, এ বছরের জানুয়ারি মাসে হাসপাতালেও ভর্তি করতে হয় তাকে। তাই কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়ার পর ঝুঁকি না নিয়ে বাড়িতেই নিভৃতবাসে ছিলেন। তিনি নিজেও হাসপাতালে যেতে চাননি। তাই বাড়িতেই চিকিত্সা চলছিল। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে আচমকাই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। গতকাল বুধবার সকালে তাকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হয়। কিন্তু চিকিত্সকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে চলে গেলেন কবি। বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ভেন্টিলেটর খুলে নেওয়া হয়।
শঙ্খ ঘোষের আসল নাম ছিল চিত্তপ্রিয় ঘোষ। পৈতৃক নিবাস বরিশালের বানারিপাড়ায়। তবে জন্ম অবিভক্ত বাংলার চাঁদপুরে, ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। বাবার চাকরিসূত্রে চাঁদপুর, পাবনা হয়ে কলকাতায় বসবাস। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন অধ্যাপনাকেই। পড়িয়েছেন কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ, সিটি কলেজ ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৭ সালে আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক লেখক কর্মশালায় যোগ দেন। পরে পড়িয়েছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, সিমলার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বহু পুরস্কারে সম্মানিত কবি। ১৯৭৭ সালে ‘মূর্খ বড়, সামাজিক নয়’ কাব্যগ্রন্থের জন্য নরসিংহ দাস পুরস্কার, ঐ বছরই ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান তিনি। ১৯৮৯ সালে ‘ধুম লেগেছে হূদকমলে’ কাব্যগ্রন্থের জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’-এর জন্য সরস্বতী পুরস্কার পান। ২০১৬ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার। ১৯৯৯ সালে বিশ্বভারতীর দ্বারা দেশিকোত্তম সম্মানে এবং ২০১১ সালে ভারত সরকারের পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত হন শঙ্খ ঘোষ। কবিতার পাশাপাশি রবীন্দ্রচর্চায়ও প্রসিদ্ধি অর্জন করেন তিনি। ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’ তার উল্লেখযোগ্য গবেষণাগ্রন্থ। প্রাবন্ধিক হিসেবেও সুবিদিত। ‘ছন্দের বারান্দা’, ‘শব্দ আর সত্য’, ‘উর্বশীর হাসি’, ‘এখন সব অলীক’, ‘কবিতার মুহূর্ত’ উল্লেখযোগ্য গদ্যগ্রন্থ। শঙ্খ ঘোষ ছোটদের জন্যও ২০টির বেশি বই লিখেছেন।
শঙ্খ ঘোষের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দিনগুলি রাতগুলি’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। এরপর বাংলা কবিতার পাঠকদের তিনি দিয়েছেন ‘মূর্খ বড় সামাজিক নয়’, ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘তুমি তো তেমন গৌরী নও’, ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘বন্ধুরা মাতি তরজায়’, ‘ধুম লেগেছে হূত্কমলে’, ‘লাইনেই ছিলাম বাবা’, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’সহ তিন ডজন কাব্যগ্রন্থ।