বারান্দার বাগানে এক জোড়া বুলবুলির আনাগোনায় ধরে নিয়েছিলাম এমনিই আসে যায়। কিন্তু না, লক্ষ করলাম কাপড় নাড়তে বা গাছে পানি দিতে গেলে তারা দুজন আমাকে যেন গালমন্দ করতে থাকে। একদিন অফিস ফেরত আমি রাতের বেলা কাপড় তুলতে বারান্দায় গিয়ে দেখি বারান্দার ওপরের তাকে রাখা তেলের কন্টিনার কেটে বানানো টবের ওপর বসে আছে বুলবুলি পাখি। আমার চোখে চোখ রেখে স্থির। ওর দু চোখের দৃঢ়তায় অবাক হয়ে গেলাম।
পরের দিন কৌতূহল চেপে রাখতে পারলাম না, চেয়ার টেনে নিয়ে উঁকি দিলাম বুলবুলি পাখির ছিমছাম পর্ণকুটিরে।
আহা কী সুন্দর বাসা। এ যেন নন্দনকানন! একটি পাখি একটু দূরে একটা তারের ওপর বসে মৃদু ভর্ত্সনা করছে, অপরটি উড়ে আমার মুখের কাছে চলে এসেছে। কুছ পরোয়া নেহি—এমনই তার প্রতিজ্ঞা! একদিকে পাখিদের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে অগ্রহণযোগ্য উঁকি দেওয়ার জন্য এক ধরনের আত্মপীড়ন, অন্যদিকে নীড়ে জড়াজড়ি করে থাকা এক জোড়া শিশুপাখি চোখে দেখার অপার্থিব সুখ। ছানা দুটির চোখ ফোটেনি। বাবা-মায়ের উপস্থিতি টের পেয়ে হলুদ নরম মুখ হাঁ করে ধরল ওপরের দিকে। আমি ঐ মুহূর্তে পৃথিবীর সব কষ্ট ভুলে গিয়েছিলাম। যদিও ওদের ডিস্টার্ব করতে চাইনি বলে আর উঁকিঝুঁকি মারিনি ওদের নীড়ে। দূরত্ব রেখে চেয়ে দেখেছি। কালো পালকে ঢেকে গেছে ছানাদের শরীর, চোখ তুলে চায় আমার দিকে। বুঝতে পারি উড়ে যেতে আর বেশি দেরি নেই ওদের।
কৌতূহল থেকে বুলবুলি পাখির আচরণ জানতে ঢুঁ মারলাম উইকিপিডিয়ায়। দেখতে পেলাম বুলবুলি দুঃসাহসী এক পাখি। পৃথিবী জুড়ে অগণিত সংখ্যায় গ্রাম, শহর, পাতাঝরা বন, প্যারাবন, বনের প্রান্তে, খেতখামার ও বাগানে বিচরণ করে। আইইউসিএন এই প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে। বুলবুলির কয়েকটি জাত রয়েছে। সিপাহী বুলবুল, সবুজ রঙের পাতা বলবুল, সাদা বুক হলদে বুলবুল বাংলাদেশে দেখা যায়। দুটি প্রজাতি নিজেদের মধ্যে সংকর বংশধর সৃষ্টি করতে সক্ষম। তবে বুলবুল বা বুলবুলি প্রচণ্ড লড়াকু পাখি। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর জুড়ে এদের প্রজননকাল। ছানাদের রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখভাল করার পুরুষ পাখি যে কী রকম দায়িত্বশীল তা দেখে আমি রীতিমতো অভিভূত। বুলবুল ‘কুইক কুইক’ করে সুরেলা কণ্ঠে গান গাইতে পছন্দ করলেও রেগে গেলে ‘ক্যাক ক্যাক’ করে তেড়ে আসে।
সুপ্তি জামান