কবি শঙ্খ ঘোষ। করোনার অভিঘাতে মৃত্যু হলো তাঁর। কিন্তু ক’দিন আগেই খবর ছিল যে করোনাক্রান্ত হলেও তাঁর শরীর স্থিতিশীল আছে। কিন্তু না, শেষ অবধি জীবনাবসান ঘটল। তিনি জন্মেছিলেন আমাদের এই বাংলাদেশে— চাঁদপুরে। তারপর পিতার শিক্ষকতার সূত্রে শৈশবের কয়েকটা বছর কাটে পাকশিতে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ছিল তাঁর নাড়ির যোগ। সেকথা তিনি ভুলতেও পারেননি। বরং আমৃত্যু মনে রেখেছেন।
কবি হিসেবে শঙ্খ ঘোষের আবির্ভাব গত শতকের পঞ্চাশের দশকে পশ্চিমবঙ্গে। বাংলা কবিতা তখন নতুন একটা বাঁক নিচ্ছিল। তিরিশের কবিকুল—তাঁদের রচনাশৈলী আর ভাষাভঙ্গিকে অগ্রাহ্য করে আবির্ভাব ঘটেছিল একদল দ্রোহী তরুণের। বোহেমীয় উদ্দাম জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁরা। তাঁদের জীবনযাপনই হয়ে উঠেছিল কবিতার বিষয়আশয়। ব্যক্তিজীবনকেই কবিতার বিষয় করে তুলেছিলেন তাঁরা। এই কবিরা উল্লিখিত ভাবনার প্রেক্ষাপটে প্রকাশ করলেন একটি পত্রিকা—‘কৃত্তিবাস’। আমেরিকান বিট কবিদের অনুসরণে তাঁরা লিখতে শুরু করলেন আত্মজৈবনিক স্বীকারোক্তিমূলক কবিতা। এখানে আরেকটু বলা দরকার, মার্কিন কবি রবার্ট লাওয়েল সর্বপ্রথম লিখেছিলেন এই স্বীকারোক্তিমূলক কবিতা। বিটদের জীবনযাপন আর লেখালেখির মধ্য দিয়ে তা আরো বিকশিত হয়। মার্কিন কবিতার এই ধারাটাই একসময় কলকাতার তরুণ কবিদের প্রভাবিত করে। গিনসবার্গ, যিনি বিট কবিদের শীর্ষকবি ছিলেন, পঞ্চাশের দশকে কলকাতায় এসেছিলেন। তিনিই তখনকার তরুণ কবিদের মধ্যে এই ধারাটি ছড়িয়ে দেন। এই ধারার পাশেই লক্ষ করা গেছে আরেক ধরনের কাব্যচর্চা। যে কাব্যচর্চায় বিটদের উদ্দাম জীবনের প্রতিফলন পড়েনি। বরং এই কবিরা লিখেছেন আত্মগহনস্পর্শী কিছুটা দার্শনিক ভাবাপন্ন কবিতা। মুখপত্র হিসেবে তাঁরা প্রকাশ করেন ‘শতভিষা’ শীর্ষক একটি পত্রিকা।
কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিয়েছেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর দার্শনিক ভাবাশ্রয়ী কবিদের নেতৃত্ব দিয়েছেন আলোক সরকার। এই মেরুবর্তী দুই গোষ্ঠীর প্রাধান্য দেখা যাবে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চাশের দশকের বাংলা কবিতায়। শঙ্খ ঘোষ ছিলেন ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রথম কবি। তাঁর কবিতা প্রথম প্রকাশের মধ্য দিয়েই প্রথম সংখ্যাটি বেরিয়েছিল। ‘শতভিষা’র সঙ্গে তিনি কখনো যুক্ত হননি। ‘কৃত্তিবাসে’ই তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু দলভুক্ত যাকে বলে, ‘কৃত্তিবাসে’র অধিকাংশ কবিই ছিলেন ‘কৃত্তিবাসে’র দলভুক্ত কবি। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ সেভাবে দলভুক্ত হননি। নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে তিনি আমৃত্যু কবিতা লিখে গেছেন।
শঙ্খ ঘোষের কবিতার বিষয়আশয়ও ‘কৃত্তিবাসে’র অন্য কবিদের মতো আত্মজৈবনিক স্বীকারোক্তিমূলক কবিতা হয়ে ওঠেনি। অর্থাত্ তিনি নিজের যাপিত জীবনকেই কবিতার বিষয় করে তোলেননি। তিনি লিখেছেন মূলত ব্যক্তিক-সামাজিক টানাপোড়েনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতমূলক কবিতা। তিনি লক্ষ করেছেন জীবন অনেক জটিল হয়ে গেছে, ব্যক্তিকজীবনের সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, ব্যক্তিমানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘাত বৃদ্ধি পাচ্ছে, রাষ্ট্রে ব্যক্তির পরিসর সংকুচিত হয়ে আসছে—এইসব অনুষঙ্গই হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতার বিষয়। ‘কৃত্তিবাসে’র অন্য কবিদের তুলনায় তাঁর কবিতা তাই ভিন্ন ঘরানা আর ভাববিশ্বের কবিতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করে। রাষ্ট্রিক জীবনের সংকট কীভাবে ব্যক্তিজীবনের সংকটকে ঘনীভূত করে, সেই ধরনের কবিতাই রচনা করেছেন। ফলে, সংবাদপত্রের সংবাদ হয়ে ওঠা ঘটনাও তাঁর কবিতা রচনার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। এরকমই একটা কবিতা হচ্ছে ‘যমুনাবতী’। পুলিশের গুলিতে যমুনা নামের এক কিশোরীর মৃত্যু হলে তিনি কবিতাটি লেখেন। সেই কবিতার কয়েকটি পঙিক্ত এখানে তুলে দিচ্ছি : ‘যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে / যমুনা তার বাসর রচে বারুদ বুকে দিয়ে / বিয়ের টোপর নিয়ে।’ বিপন্ন ব্যক্তিজীবন এভাবেই তাঁর কবিতায় স্থান করে নিয়েছে। আরেকটি কবিতার কয়েক পঙিক্ত : ‘ছোট হয়ে নেমে পড়ুন মশাই / সরু হয়ে নেমে পড়ুন মশাই / চোখ নেই? চোখে দেখতে পান না? / সরু হয়ে যান, ছোটো হয়ে যান—’। গোষ্ঠী-জীবনের অভিঘাতে ব্যক্তিজীবন কীভাবে বিপন্ন হয়ে পড়ে, এ হচ্ছে সেই ধরনের কবিতা। মানুষ যে ক্রমশ তার সত্তাকে হারিয়ে বামন হয়ে পড়ছে, ছোটো হয়ে যাচ্ছে, সেই ছবিটি এখানে বেশ স্পষ্ট।
এ তো গেল সমকালের দৈনন্দিন জীবনের সংকটের কথা, যে সংকটে ব্যক্তিজীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু এছাড়া তাঁর কবিতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পুরাণের ব্যবহার। সেই ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তিনি ব্যক্তিক সংকটকেই উপজীব্য করেছেন। আছে উল্লেখযোগ্য ছন্দনীরিক্ষা।
আমার এই লেখার উদ্দেশ্য তাঁর কবিতার মূল্যায়ন নয়। আমি আসলে লিখতে বসেছি প্রয়াণলেখ, ইংরেজিতে যাকে বলে অবিচ্যুয়ারি। মৃত্যু-পরবর্তী স্মরণ-রচনা। শঙ্খ ঘোষের অন্য দিকগুলিও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা জরুরি। প্রথমেই বলি, লেখালেখির সূত্রে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার জ্ঞানপীঠ পেয়েছেন। পেয়েছেন আরো অসংখ্য পুরস্কার। কবিতা ছাড়াও তিনি লিখেছেন গদ্য। রচনার বিপুলতা আর ভাবনার বৈভবে সমৃদ্ধ সেইসব গদ্য বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির চিন্তামূলক গদ্য হিসেবে উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে। সমকালীন সাহিত্য, বিশ্বসাহিত্য, অনুবাদ, বাংলা ছন্দ আর রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তাঁর লেখাগুলি অবিস্মরণীয় ভাবসম্পদে উজ্জ্বল।
সাহিত্যের বাইরে তাঁর আরেকটি ভূমিকাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণযোগ্য। আর তা হচ্ছে তিনি ব্যক্তিপর্য়ায়ে অনেক লেখক ও গবেষককে তাদের লেখালেখির বিষয়ে সাহায্য করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও তিনি নানা অনুষ্ঠান ও কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকেছেন। এমনকি এই সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের বাইরে মানুষের জীবন যখন নানা কারণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে, তিনি তার প্রতিবাদ করেছেন। বোঝাই যায়, তিনি ছিলেন সবার আশ্রয়স্থল। বিবেকী প্রতিবাদী স্বর। বাংলাদেশের সঙ্গেও তাঁর ছিল নিবিড় সম্পর্ক। এখানে জন্মেছিলেন বলেই হয়তো নাড়ির টান অনুভব করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। যখনই সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশে চলে এসেছেন। বাংলা ভাষাভাষি লেখকদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনে তাঁর ভূমিকা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে। সবমিলিয়ে বলা যায়, তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন একটা প্রতিষ্ঠান। তাঁর প্রয়াণে তাই যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল, তা কোনোদিনই পূরণ হবে না। আমি তাঁর মৃত্যুতে ব্যক্তিগতভাবে শোকপ্রকাশ করছি।
শঙ্খ ঘোষ - জন্ম :৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ মৃত্যু :২১ এপ্রিল ২০২১