শিক্ষার্থীরা একটি নির্দিষ্ট শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে শিক্ষা লাভ করে

সরকার আবদুল মান্নান

স্যার ফিলিপ পুলম্যানকে ( জন্ম ১৯শে অক্টোবর, ১৯৪৬, ইউকে) আমরা কথাসাহিত্যিক হিসেবে চিনি। বহু জনপ্রিয় উপন্যাসের রচয়িতা তিনি। কিন্তু শিশুশিক্ষা নিয়ে তাঁর ভাবনা আমাদের মুগ্ধ করে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই বিপ্লবের যুগে শিশুরা যেখানে চিন্তা ও মননের এক উদ্বাস্তু সময় অতিবাহিত করছে, সেখানে পুলম্যানের একটি লেখা খুবই সময়োপযোগী। ২০১২ সালে Astrid Lindgren Memorial Award -এর ১০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তিনি বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন এবং সেই লেখাটির প্রেরণা থেকে আমি এই নিবন্ধটি রচনা করেছি।

একটি উদ্ধৃতি দিই। ‘Children need art and stories and poems and music as much as they need love and food and fresh air and play.’ একজন শিশু যদি খাবার না পায়, পুষ্টিকর খাবার থেকে যদি সে বঞ্চিত হয়, তাহলে সে দুর্বল হয়ে পড়বে, রুগ্ন হয়ে পড়বে। তার দৈহিক অবয়বে ক্রমেই সেই রুগ্নতা দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা বোঝতে পারব যে, শিশুটি খাদ্যাভাবে ও অপুষ্টিতে ভুগছে। শিশুরা যদি মুক্ত বায়ুতে খেলাধুলা করার সুযোগ না পায়, সেটাও এক সময় পরিলক্ষিত হবে। তবে রাতারাতি নয়। দীর্ঘদিন পরে সেই ক্ষতি লক্ষ করা যাবে এবং আমরা অনুভব করবো যে, তার স্বাভাবিক ও আনন্দিত বিকাশ হয়নি। শিশুরা যদি যথাযথ যত্ন ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়, তা হলে তার মননের জগতে যে ক্ষতি সাধিত হবে, তা হয়তো হুট করে চোখে পড়বে না, কিন্তু সেই ক্ষতি হবে স্থায়ী। এই ক্ষতির কোনো নিরাময় নেই।

প্রতিটি দেশেই শিক্ষার্থীরা একটি নির্দিষ্ট শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে শিক্ষা লাভ করে। সেই প্রক্রিয়াটি কেমন সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার ভেতরে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাঠ আছে কি না, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাকে যদি শিল্পকলার চর্চার মধ্যে, গল্প-উপন্যাস পাঠের মধ্যে, কবিতা পাঠের মধ্যে এবং গান শোনার মধ্যে বড় হতে না দেওয়া হয়, তা হলে শিশুর সামগ্রিক বিকাশে যে ক্ষতি সাধিত হবে, চর্মচক্ষে তা দেখার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি উদার, মানবিক ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ ছাড়া স্থূল প্রকৃতির মানুষ কখনই এই ক্ষতি উপলব্ধি করতে পারবে না। আর এই ক্ষতি হলো তাদের বুদ্ধিবৃত্তির জগতের ক্ষতি। জীবনবোধ, জীবনোপলব্ধি ও জীবনতৃষ্ণার জগতে বিপুল ক্ষতি।

ধরা যাক একজন শিশু সুস্থ-সবল, স্বাস্থবান। দৌড়ায়, লম্ফঝম্প দেয়, খেলাধুলা করে, হৈচৈ করে, সাঁতার কাটে এবং প্রচুর ক্ষুধা নিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ খায়। তার মানে, শিশুটি ঠিক আছে। ঠিকঠাক মতো চলছে সবই। কিন্তু কিছু একটা বাদ পড়ে যাচ্ছে। আর সেটা হলো শিল্প-সাহিত্যের চর্চা, সংগীতের চর্চা। আর এ সবের চর্চা যদি না হয়, তা হলে ক্ষতি কী! যদি আমাদের সমাজে অধিকাংশ মানুষের দিকে তাকাই, তা হলে কী দেখতে পাই? কোনো ধরনের শিল্প-স্থাপত্য-ভাস্কর্য নিয়ে তাদর কোনো আগ্রহ নেই। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের ঘরে কোনো বই নেই, কোনো চিত্রকর্ম নেই, গান করা বা গান শোনার কোনো ব্যাপার নেই। তাদের কি কোনো সমস্যা আছে? পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে চলতে গিয়ে তাদের কী কোনো রকম প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়? নিশ্চয়ই নয়। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, তারা সুখেই আছেন এবং পরিবারে, সমাজে, কর্মস্থলে আনন্দ-ফূর্তিতেই সময় অতিবাহিত করছেন। এবং তারা যে বইপুস্তক পড়েন না, শিল্প-সাহিত্যের চর্চা করেন না, গান করেন না বা শুনেন না- এ সবের অভাবের জন্য কেউ তাদের প্রত্যাখ্যানও করছেন না। অর্থাত্ সব ঠিকঠাকই থাকে।

কিন্তু সব সময় সব ঠিকঠাক থাকে না। এদের অনেকের মধ্যে সুন্দর ও অসুন্দরের বোধ তৈরি হয় না। ন্যায়-অন্যায়ের সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো তারা অনুধাবন করতে পারেন না। কথায়-কাজে-আচরণে যে পরিশীলন ও সংস্কার থাকতে হয়- তাদের মধ্যে সেই বোধ কাজ করে না। এরা আবেগ সংবরণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। অনেক সময় এদের মধ্যে যৌক্তিকতাবোধও কাজ করে না। ফলে জীবনের বিচিত্র ক্ষেত্রে এরা অন্যের শান্তি নষ্টের কারণ হয়ে ওঠেন, কিংবা তার শান্তি নষ্ট হচ্ছে মনে করে অন্যের প্রতি অবিচার করেন।

কিন্তু এর চেয়েও ভয়াবহ ক্ষতির দিক আছে। আর তা হলো মৌলবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনকে দেখা। শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাঠ না থাকলে ধর্মীয় মৌলবাদে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। বাধভাঙ্গা পানি যেমন প্রচণ্ড বেগে ভাঙ্গনের দিকে ছুটে চলে, তেমনি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভেতর  দিয়ে বিকাশের বিচিত্র পথ যাদের রুদ্ধ হয়ে যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের বিকাশ ঘটে বিকৃতির মধ্যে, অসুস্থতার মধ্যে। এর মধ্যে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক হলো ধর্মীয় জঙ্গীবাদের প্রতি অনুরক্ত হওয়া ও বিশ্বাস স্থাপন করা।

অর্থাত্ সাংস্কৃতিক স্বাক্ষরতা (খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সাংস্কৃতিক স্বাক্ষরতা। এই নিবন্ধের স্বল্প পরিসরে ওই বিষয় নিয়ে আলোচনা করা ঠিক হবে না।)  অর্জন না-করলে এবং শিল্প-সাহিত্য ও সংগীতে অনুরাগ সৃষ্টি না-হলে যুক্তিবোধ তৈরি হয় না। ফলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে যে মনোগড়ন তৈরি হয় তা মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। আর এ হেন মনোগড়নের মানুষ ফেন্টাসিকে বাস্তব ও সত্য বলে জ্ঞান করে এবং নির্বোধের মতো নিষ্ঠুর পরিস্থিতি তৈরি করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না।

এই পরিস্থিতির জন্য শিশু-কিশোরদের দায়ী করা যায় না। বরং তাদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে পরিবার ও বিদ্যায়তনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।