অণুগল্প

সুখে থাকা মানুষের গলি

 

ছুপা রুস্তমের গলিতে সব সময় সকাল আটটা বাজে। চৈত্রের দুপুরে যখন কোকিল ডাকে তখনো ঐ গলিতে আটটা বাজে। ভর সন্ধ্যায় যখন মুরগিরা ঘরে ঢোকে তখনো ছুপা রুস্তমের গলিতে বাজে আটটা। ঐ গলির সব বাসিন্দার ঘড়ির কাঁটা আটটায় আটকে আছে। সেই যে, বাঘের গলায় হাড় গিয়েছিল আটকে। কেউ সাহস করে হাত ঢোকাতে যায়নি বাঘের গলায়, ছুপা রুস্তমের গলির অবস্থাও তেমন।

কেউ গলা তুলে বলে, নাথ হে আটটা তুমি এবার বন্ধ করো তোমার যাবতীয় ঠাট্টা।

গলির মোড়ে ছুপা রুস্তমের চায়ের দোকান। সারা দিন শত মানুষের আনাগোনা। সবাই চা খায় গল্প করে বাহাস করে ভূগোল উলটিয়ে দেয়; কিন্তু আটটার পরিবর্তে তারা নয়টা বাজাতে পারে না, দশটা এগারোটা বারোটা এসব তো দূরের কথা। মানুষের পর মানুষ বদলে যায় কিন্তু সময় বদলায় না। ছুপা রুস্তম ঠিক যেভাবে একা একা গলির মোড়ে চায়ের দোকান সামলায় তেমনি আটটা সকাল আটটা বাজতে থাকে ছুপা রুস্তম গলিতে।

বছর দশেক আগেই এই গলিতে একবার তুমুল ঝামেলা হয়েছিল। মধ্যরাতে দুই পকেটমার তাদের টাকা ভাগাভাগি করতে বসেছিল। সেখানেই একটা আধুলি কার ভাগে যাবে তাই নিয়ে শুরু হয়েছিল ঝামেলা-গণ্ডগোল। প্রথমে তর্ক এরপর হাতাহাতি তারপর লাঠালাঠি সবশেষ গোলাগুলি হয়েছিল, দুই পকেটমারের লাশ পরদিন পড়েছিল গলির মোড়ে চায়ের দোকানের সামনে। ঐ একদিনই বন্ধ ছিল চায়ের দোকান। ছুপা খুলতে চেয়েছিল দোকান কিন্তু পুলিশে হাঙ্গামায় তা সম্ভব হয়নি। তারপরও সেদিন আটটাই ঝুলেছিল সবার ঘড়িতে। এমনকি যে দুই পকেটমার সেদিন পরস্পরকে হত্যা করেছিল তাদের ঘড়িতেও তখন আটটা বাজছিল।

ঐ গলির সবচেয়ে প্রবীণ লোকটা এই কিছুদিন আগে এক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাত্কারে বলেছেন ‘আটটা না বাজলে না ঠিক জুইত লাগে না।’

ছুপা রুস্তমের কাছেও এসেছিল সেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। ক্যামেরার সামনে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল ছুপা। এরপর এক অদৃশ্য ঘড়ির প্রতিচিত্র আঁকে সে। তাতে একটিমাত্র কাঁটা, ঘণ্টার কাঁটা আর সেটি আটকে যায় আটটার ঘরে।

ঐ খবরটিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে একবারই সম্প্রচারিত হয়েছে সকাল আটটার ঠাট্টার বুলেটিনে। ‘ছুপা রুস্তমের গলির মানুষগুলো খুব সুখে আছে’ এই শিরোনামে।