সংগীত

বিরহের গান

 

যে গানের বাণীতে গভীরতম বেদনার ভাষা ফুটে ওঠে সেই গানই তো মধুর—ইংরেজ কবি শেলির  এ কথা অনেকেরই জানা। বিরহের গানের আবেদন চিরন্তন। এ ধরনের গানের বাণী এবং সুর শ্রোতার হূদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। যাঁদের হূদয় জুড়ে আছে বিরহ-বেদনা শুধু তাঁরাই নন, গান যাঁরা ভালোবাসেন তাঁরাও দিনের পর দিন শুনেছেন বিরহের গান। নিজের জীবনের সঙ্গে মিল খোঁজার চেষ্টাও করেছেন অনেকে। ‘জোয়ার এলো’ (১৯৬২) ছবিতে প্রেমিকের সঙ্গে নয়, সর্দারের ছেলের সঙ্গে নায়িকার বিয়ের সানাই বাজতেই দু চোখের জল ফেলে নায়িকা গেয়েছিলেন—‘নিশি জাগা চাঁদ হাসে কাঁদে আমার মন/তাই মরমিয়া সুরে পাখি কাঁদায় বিজন বন’। বিরহের এই গানে কণ্ঠ দিয়ে ফেরদৌসী রহমান স্মরণীয় হয়ে আছেন। ‘রূপবান’ (১৯৬৫) ছবিতে নীনা হামিদের গাওয়া ‘সাগর কুলের নাইয়া রে অপর বেলায় ও মাঝি কোথায় চলছ বাইয়া রে/বারো বছর রইলেম আমি পারাঘাটাতে বসিয়া’—এই গান এক সময় ছিল লোকের মুখে মুখে। স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বশির আহমদ  ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’ গানের মাধ্যমে। সাবিনা ইয়াসমীনকে মনে রাখতেই হবে ‘অশ্রু দিয়ে লেখা এ গান যেন ভুলে যেও না’ এই গানের জন্য। আর মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের ‘এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি কেন একা বয়ে বেড়াও’ কোনোদিনই হারিয়ে যাবে না।

এসব গানেরও বহু বছর আগে বিরহের গান শুনে বাস্তবেই নদীতীরে এসে বসত প্রিয়া। প্রেমিকের অনুপস্থিতি তার অন্তরে জ্বালিয়ে দিত বিরহের আগুন। বিরহকাতর হয়ে পড়ত। ক্ষণিকের জন্য হলেও ‘চন্দ্রশেখর’ (১৯৪৭) কিংবা অন্য কোনো ছবির বিরহের দৃশ্য চোখে ভেসে উঠত। ছবির নায়িকা (প্রিয়তমা) তাঁর প্রেমিককে কাছে না পেয়ে গলার মালা নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে গেয়েছিলেন, ‘ভাসিয়ে দিলেম মালা তবে প্রিয় যাই চলে/তুমি যদি আসিবে না এ মালা নেবে না গলে...।’ ‘চন্দ্রশেখর’ যাঁরা দেখেছিলেন তাঁদের অন্তরে বিরহিণী সেই নায়িকা কানন দেবীর এই মর্মভেদী গান এখনো দাগ কাটে। প্রেমিক অশোক কুমারের সঙ্গে বিয়ে হলো না কানন দেবীর, নৌকায় নববধূ চলেছেন ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে। তখনই ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে উঠল—‘কী দোষে ছাড়িলে বন্ধু দিলে বিষম জ্বালা/হায় বিফলে শুকায় গো আমার হিজল ফুলের মালা/মালা ছিঁড়ে না যে বুকে বাজে কী করি উপায়।’ গানের এই দৃশ্য দর্শককে কাঁদিয়েছে।

জগন্ময় মিত্রের গাওয়া প্রায় সব গানের কথায় ছিল বিরহ বেদনা-দুঃখের বহিঃপ্রকাশ। যেমন ‘তুমি আজ কত দূরে/আঁখির আড়ালে চলে গেছ’; ‘ঝরা ফুলে ভরা এই যে সমাধিতল’; ‘ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে, তোমারে করেছে রানি’। শচীন দেব বর্মনের—‘আজি এই মায়াভরা মধু নিশীথে বঁধুর মনে মন চায় মিশিতে/মালাখানি হলো যে গো ফুল ঝরানো/জীবনে সবই যেন ভুল ভরানো’ আর ‘দূর কোন পরবাসে তুমি চলে যাইবা রে...পদ্মপাতায় রাতের শিশির সম/যাইবে শুকায়ে হায় রে পিরিতি মম’ আজো হারিয়ে যায়নি। প্রেম-ভালোবাসা, দুঃখ, বিরহ, আঘাত আছে বলেই তো গান সৃষ্টি হয়েছে। বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, চটকা, গম্ভীরা, সারি, জারি, আধুনিক, পপ, ডিসকো, ব্যান্ড, ছায়াছবির গান অর্থাত্ সব ধরনের গানের কথায় আছে কম-বেশি বিরহ। বিরহের গানের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ধারা হলো রাধা-কৃষ্ণ বা চৈতন্য বিষয়ক গান। বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর কণ্ঠে বিশেষ করে বিরহের গান শোনা যায় আজো। ভাওয়াইয়া গানে পাই ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই কত রব আমি পন্থের দিকে চাইয়া রে...’ বিরহ ভারাক্রান্ত হূদয়ের আকুতি। প্রিয় মানুষ গাড়িয়াল কাছে নেই, চিলমারি বন্দরে সে নিরুদ্দিষ্ট। এই গান গেয়েই তো আব্বাস উদদীন আহমদ অমর হয়ে আছেন। 

লিয়াকত হোসেন খোকন