উদ্বেগ আর আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে পুরান ঢাকার মানুষদের। আতঙ্কের কারণ ব্যাপক ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যালের গুদাম। যার অধিকাংশই অবৈধ। এর আগে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা ও নিমতলীতে ভয়াবহ দুটি অগ্নিকাণ্ডে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল ভোরে আরমানিটোলায় কেমিক্যাল গোডাউনে আগুন লেগে মারা গেছেন কলেজ ছাত্রীসহ ৪ জন। কিন্তু বারবার দুর্ঘটনার পরও সরানো যাচ্ছে না এসব কেমিক্যাল গোডাউন।
জানা গেছে, স্থানান্তরের বিকল্প জায়গা না থাকার অজুহাত দেখিয়ে মালিকরা সরাচ্ছেন না তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। চলতি বছরের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছিলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে পুরান ঢাকার সব অবৈধ কেমিক্যাল কারখানা এবং প্লাস্টিক গোডাউন সরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিকল্প জায়গা দেওয়ার পরও মূলত মালিকদের একগুয়েমির কারণে সরানো যাচ্ছে না এসব কারখানা ও গোডাউন। এ ব্যাপারে প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) ২০১৭ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় রয়েছে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিক দাহ্য বস্তুর গুদাম। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে খোদ বাসা-বাড়িতেই। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। ২০০ ধরনের ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা চলে এখানে। অবৈধ ব্যবসায়ীদের তথ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
২০১০ সালের জুন মাসে নিমতলী ট্র্যাজেডির পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই এলাকা থেকে অবৈধ রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো এখনো সরেনি একটি কারখানাও। ২০১৯ সালে আবার আগুন লাগে চুরিহাট্টা এলাকায়। ঝরে পড়ে ৭১টি তাজা প্রাণ। কারখানা সরাতে আবারও গঠিত হয় কমিটি। এরপরেও সরেনি গুদাম।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম জানিয়েছেন, আমরা পেট্রোলিয়াম জাতীয় দ্রব্যের অনুমোদন দেই। তবে পুরান ঢাকায় আমাদের অনুমোদিত কোনো গুদাম নেই। যেগুলো আছে সেগুলো সবই অবৈধ। দিনের পর দিন এগুলো কীভাবে চলছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাঝে মধ্যেই সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন সেখানে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালাচ্ছে। অবৈধ গুদামগুলো সিলগালা করা হচ্ছে, জরিমানা করা হচ্ছে। অনেককে জেলেও পাঠানো হচ্ছে। আমরা সহযোগিতা করি।
এদিকে আরমানিটোলায় অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপারে ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহিদুল ইসলাম বলেছেন, যতদিন পর্যন্ত কেমিক্যাল গোডাউন স্থানান্তর করা না হবে ততদিন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে অগ্নিকাণ্ডে আহতদের দেখতে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। যারা এই কেমিক্যাল গোডাউন করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা তাদের লাইসেন্স বাতিল করব। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জেল-জরিমানার ব্যবস্থা করব। এখনো কী পরিমাণ কেমিক্যাল সেখানে মজুদ রয়েছে এ বিষয়ে বিস্ফোরক অধিদপ্তর খতিয়ে দেখছে।
আরমানিটোলার হাজী মুসা ম্যানশনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক বজলুর রশিদ জানিয়েছেন, পুরান ঢাকার প্রায় প্রতিটি ভবনের নিচেই কেমিক্যালের গোডাউন। আমরা শত শত বার বলেছি ও প্রতিবেদন দিয়েছি। তারপরও কেমিক্যাল গোডাউনগুলো সরানো যাচ্ছে না। নিচে কেমিক্যাল ওপরে বাসা-বাড়ি এটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঐ ভবনের নিচ তলা ও দ্বিতীয় তলায় প্রতিটি রুমেই ছিল কেমিক্যালের গোডাউন। এরপর তিন, চার, পাঁচ ও ছয় তলায় বাসাবাড়ি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার জানান, এসব কারখানা সরাতে আমরা বারবার প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে চিঠি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সরছেন না। গত বছর কিছু কারখানার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযানও পরিচালনা করা হয়েছে। এই এলাকার সব কেমিক্যাল কারখানা ও গোডাউনের আগে দেওয়া সব ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছি। এরপরও তারা আইন অমান্য করে অবৈধভাবেই ব্যবসা চালাচ্ছেন।
জানা গেছে, ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে ঢাকা মহানগরের আবাসিক এলাকা থেকে অবৈধ রাসায়নিক কারখানা ও গুদামগুলো কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজন্য বিসিকের চেয়ারম্যানকে প্রধান করে একটি এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে আরেকটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০১৪ সালের ৩ জুন শিল্প সচিব বলেছিলেন, কেমিক্যাল পল্লিতে সাততলা ১৭টি ভবন তৈরি করে গুদাম সরানো হবে। পরের বছর ২ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জে ২০ একর জায়গায় পল্লি স্থাপন করার কথাও বলেন তিনি। কেমিক্যাল পল্লিতে সরিয়ে নেওয়ার কাজ কতদূর—এমন প্রশ্নের জবাবে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল, কেমিক্যাল পল্লি প্রকল্পটি ২০২১ সাল পর্যন্ত। ৫০ একরের প্রকল্প। প্রায় ৯৫০টি গুদাম সরানো যাবে। কিন্তু এখনো একটি গুদামও সরেনি।
সর্বশেষ জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে পুরনো ঢাকার সব অবৈধ কারখানার তালিকা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। কিন্তু প্রাপ্ততথ্যে জানা যায়, তারও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ইত্তেফাক/কেকে