পদার্থবিদ্যায় দোলক

মাধব রায়, কথাসাহিত্যিক ও সহকারী অধ্যাপক

ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট

নীলকান্তবাবু অফিস থেকে ফিরে দেখলেন বিন্দু আম গাছের ডালে রশি বেঁধে একটা দোলনা বানিয়ে দোল যাচ্ছে। আকাশ তাকে এই কাজে সহযোগিতা করছে। সে গাছে উঠে ডালে রশি বেঁধে ঝুলিয়ে দিয়েছে, আর নিচে একটা কাঠের তক্তা বেঁধে বসার ব্যবস্থা করেছে। এতে ভাইবোন সকলেই খুশি। সবাই কিছুক্ষণ করে দোল খেয়ে খেয়ে এর দখলদারিত্ব বিন্দুকে দিয়ে দিয়েছে। বিন্দু এখন আর কাউকে দিচ্ছে না। ওর যতক্ষণ ইচ্ছা, সে দুলতে থাকবে। অণু একে পিছন দিক থেকে আস্তে আস্তে ঠেলে দিচ্ছে, দোলনাটা দূরে যাচ্ছে, আবার আসছে। অণু ঠেলছে। বিন্দুর মুখের দুইপাশে বেণী দুটোও বাতাসে দুলছে, চমত্কার দৃশ্য মনে হচ্ছে নীলকান্তবাবুর কাছে। তিনি চুপিচুপি বিন্দুর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। খেয়াল করলেন বিন্দু ভালো করে রশি ধরে আছে কি-না, হঠাত্ করে তিনি একটু জোরে ঠেলে দিলেন বিন্দুকে। মাগো! বলে চিত্কার করে উঠল বিন্দু। নীলকান্তবাবু হেসে উঠলেন। সবাই হাসল। বিন্দু চেয়ে বাবাকে এই কাজ করতে দেখে রেগে উঠল। বাবা! তুমিও দুষ্টুমি করছ!

নীলকান্তবাবু বললেন-দেখলাম তুই ভয় পাস কিনা।

যদি পড়ে যেতাম?

পড়বি না, আমি দেখেছি ভালো করে, রশি ধরে আছিস।

না বাবা, তুমি ভালো কাজ করোনি।

আচ্ছা, ঠিক আছে, আর করব না।

বিন্দু আস্তে আস্তে মাটিতে পা দিয়ে দোলনাটাকে থামিয়ে দিলো, আর দুলবে না।

এবারে রেখা বসল, ঠিক আছে আমি বসি, বাবা ধাক্কা দাও, আবার জোরে দিও না কিন্তু।

নীলকান্তবাবু আস্তে আস্তে ঠেলতে লাগলেন। বললেন-বল তো দেখি দোলনায় দোল খেতে কেন আরাম লাগে?

সবাই চুপ করে থাকল। জানিস না, বললেন তিনি।

দোলনাটা একটা গতিতে দুলছে, এর নাম সরল ছন্দিত গতি। আমি যখন জোরে ধাক্কা দিলাম, তখন সরল ছন্দিত গতি নষ্ট হয়ে গেল, বিন্দুর আরাম আর থাকল না।

এই গতিটা কী রকম? বলল অণু।

এই গতি একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর নির্দিষ্ট বিন্দুকে একই দিক থেকে অথবা বিপরীত দিক থেকে অতিক্রম করে।

চন্দ্রা ভাবছে মামা কী বলছে। নির্দিষ্ট সময় পরপর একই দিক থেকে অথবা বিপরীত দিক থেকে অতিক্রম করে, তাহলে ঘড়ির কাঁটার গতিও এরকম? প্রশ্ন করল।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছিস। ঘড়ির কাঁটার গতি, সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি, পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের ঘূর্ণনগতি, ফ্যানের গতি এই বৈশিষ্ট্য মেনে চলে।

কিন্তু বিপরীত দিক থেকে আবার কীভাবে? পৃথিবী কি কখনও উল্টো ঘুরবে? বিন্দু বলল।

না না, পৃথিবী উল্টো ঘুরবে না। দোলনাটা যখন স্থির আছে, তখন আস্তে আস্তে ধাক্কা দিলে দূরে চলে গেল, আবার ফিরে এসে কোন পর্যন্ত যাবে, যে জায়গায় স্থির ছিল সেখান পর্যন্ত?

না না, আরও পিছনে যাবে। বলল বিন্দু।

তাহলে স্থির বিন্দুর দিকে এবং বিপরীত দিক থেকেও আসছে, দুইদিক থেকেই আসছে। দেয়াল ঘড়ি দেখেছিস? বল দোলে যে ঘড়িতে?

টিভিতে দেখেছি, নাটকে, বলল কণিকা, জমিদার বাড়ি বা পুরনো আমলের বাড়ির দৃশ্যে।

দেয়াল ঘড়ির বলটার মতো আমাদের দোলনাটাও। যখন স্থির থাকবে তখন এই অবস্থাকে বলি সাম্যাবস্থা। সাম্যাবস্থা থেকে ডানে বা বামে যতটুকু কোণ সৃষ্টি করে তাকে বলে কৌণিক বিস্তার। কৌণিক বিস্তার যদি ৪ ডিগ্রির বেশি না হয়, তাহলে দোলকটি দুইদিকেই সমান দূরত্ব অতিক্রম করবে।

আর জোরে ধাক্কা দিলে? বলল সীমা।

জোরে ধাক্কা দিলে কৌণিক বিস্তার ৪ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাবে। ফলে উভয় দিকে সমান দূরত্ব অতিক্রম করবে না। বিন্দুকে জোরে ধাক্কা দিলাম, এটি ৪ ডিগ্রি ছড়িয়ে গেল, বিন্দু ভয় পেয়ে গেল। সবাই নিরবে শুনছে। নীলকান্তবাবু বললেন-এ নিয়ে গ্যালিলিওর একটা চমত্কার ঘটনা আছে।

চমত্কার ঘটনা শুনে সবার আগ্রহ বেড়ে গেল। নীলকান্তবাবু বলতে লাগলেন-ইটালির পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিক্যাল সায়েন্স পড়ার সময় ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে একদিন গ্যালিলিও অনেকের সাথে বসে আছেন ক্যাথিড্রালে। প্রার্থনা করছেন। মাঝখানে একটা লম্বা শিকল দিয়ে লণ্ঠনের ঝাড়বাতি ঝুলানো ছিল। একজন কর্মী প্রদীপ জ্বালানোর সময় অন্যমনস্কভাবে ঝাড়বাতিটা নাড়িয়ে দিয়ে গেল। গ্যালিলিও খেয়াল করলেন। ঝাড়বাতিটা প্রতিটি দোলনে একই সময় নিচ্ছে। লম্বা দোলনই দিক আর খাটো দোলনই দিক সময় একই নিচ্ছে। হাতের কব্জি টিপে নাড়ির স্পন্দন গুণে দেখলেন সময় সমান লাগছে। দ্রুত ফিরে গেলেন নিজের ঘরে। বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের সূতা এবং দোলক নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। দেখলেন, প্রত্যেকটা দোলন একই সময় নেয়। দোলকটা একটা বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করে সর্বশেষ বিন্দুতে গিয়ে আবার ঐ বিন্দুতে ফিরে এলে বলা হয় একটি পূর্ণ দোলন এবং এর সময়কে বলা হয় দোলনকাল বা পর্যায়কাল। আর এক সেকেন্ডে যতগুলো দোলন দিতে পারে তাকে বলা হয় কম্পাংক। গ্যালিলিও দেখলেন একই জায়গা থেকে দুলতে দিলে দোলনকাল দোলকের দৈর্ঘ্যের বর্গমূলের সমানুপাতিক।

মানে হচ্ছে দৈর্ঘ্য বাড়লে দোলনকাল বেড়ে যাবে, দৈর্ঘ্য কমলে দোলনকালও কমে যাবে। বলল সীমা।

                পরের অংশ আগামীকাল