ভারতীয় রাজনীতিতে ১৯৮৪ সালে বিজেপির যাত্রা শুরু লোকসভায় মাত্র দুই আসন পেয়ে। তবে ভোটপ্রাপ্তির বিচারে সেবার জাতীয় কংগ্রেসের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম দল ছিল তারাই। পেয়েছিল ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ ভোট। পরের ৩৭ বছরে বহরে বেড়েছে বিজেপি। নেতৃত্ব বদলের সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বেড়েছে প্রভাব। সর্বশেষ ভারতের লোকসভায় ২০১৪ এবং ২০১৯ সালে পরপর দুবার জিতে বিজেপি ক্ষমতায়। আসনও অনেক বেড়েছে। তুলনায় ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা বিরোধী দলগুলোর। শতবর্ষ প্রাচীন জাতীয় কংগ্রেস এবারও বিরোধী দলের মর্যাদা পায়নি। তাদের দখলে রয়েছে মাত্র ৫১ আসন। বিভিন্ন রাজ্যে রয়েছে আঞ্চলিক দলগুলোর প্রভাব। তবে তাদের প্রয়াস ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির গেরুয়া ঝড় ঠেকানোর জন্য মোটেও যথেষ্ট ছিল না। লোকসভার মতো ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের বিধানসভায়ও বিজেপির দাপট। ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভারতের ১৮ রাজ্য বিজেপি ও এনডিএর সহযোগী দলের দখলে রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি রাজ্যে বিজেপি এককভাবে ক্ষমতায়। ভারতের কোন রাজ্যে কারা ক্ষমতায় রয়েছে, সেটা দেখে নেওয়া যাক। বিজেপির একক দখলে থাকা রাজ্যগুলো হলো—হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখন্ড, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, কর্ণাটক, গোয়া, আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, ত্রিপুরা, মণিপুর। বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএর দখলে থাকা রাজ্যগুলো হলো হরিয়ানা, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মেঘালয়, সিকিম, বিহার ও তামিলনাড়ু। অন্যদিকে কংগ্রেসের দখলে থাকা রাজ্যগুলো হলো পাঞ্জাব, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট ইউপিএর দখলে থাকা রাজ্যগুলো হলো মহারাষ্ট্র ও ঝাড়খন্ড। এ ছাড়া আঞ্চলিক দলের দখলে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা, অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা, কেরালা ও দিল্লি। এসবের বাইরে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি আছে জম্মু কাশ্মীর, লাদাখ ও পন্ডিচেরিতে।
বিজেপির বিজয়রথের গতি প্রবল উত্তর ভারতের গোবলয়ে। এর বাইরে গুজরাট এবং উত্তরপূর্ব ভারতেও সেই প্রভাব বিস্তার লাভ করেছে। তবে বিন্ধ পর্বতের দক্ষিণ প্রান্তে তাদের সেই বিজয়রথের গতি অনেকটাই সীমাবদ্ধ। দাক্ষিণাত্যে একমাত্র কর্ণাটক ছাড়া অন্যত্র তেমন তাদের বিজয়রথ গতি পায়নি। পাশের ছোট রাজ্য গোয়ায়ও তাদের সরকার রয়েছে, তবে নির্বাচন-পরবর্তী জোট গড়ে। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতেও (লোকসভায় ৩৯ আসন রয়েছে) এআইডিএমকের (অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাভিড় মুনেত্রা কাজাগাম) সঙ্গে তাদের জোট রয়েছে। এখানেও জোট বিধানসভা ভোট-পরবর্তী হওয়ায় তা এখনো পরীক্ষিত নয়। তবে এই জোট ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সাফল্য পায়নি। পেয়েছিল ৩৯টির মধ্যে মাত্র একটি আসন।
অতীতে দখলে থাকা গোবলয়ের রাজস্থান, ঝাড়খন্ড, ছত্তিশগড় রাজ্য এবং এর বাইরে থাকা মহারাষ্ট্রও বিজেপির হাতছাড়া হয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর ভারতে পাঁচটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে বিজেপির ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়েছে একমাত্র বিহার ও হরিয়ানায়। বিহারে নীতিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেডের (জেডিইউ) সঙ্গে জোট করে ফের ক্ষমতায় ফিরতে পেরেছে বিজেপি। হরিয়ানায় জননায়ক জনতা পার্টি এবং স্বতন্ত্র এমএলএদের সঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী জোট গড়ে আরেকবার সরকার গড়তে সমর্থ হয়। তবে মহারাষ্ট্র, ঝাড়খন্ড ও দিল্লি থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তাদের। এর মধ্যে মহারাষ্ট্র ও ঝাড়খন্ড ছিল বিজেপির দখলে। দিল্লিতে লোকসভায় দুর্দান্ত সাফল্যের আঁচ পড়েনি বিজেপির ঝুলিতে। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি ফের সেখানে ক্ষমতা দখল করে।
অর্থাত্, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর বিজেপির দখলে থাকা রাজ্যের সংখ্যা কমেছে। মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক রাজ্য ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির হাতছাড়া হয়। জাতীয় কংগ্রেস সেখানে জয় পায়। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় এই দুই রাজ্যে বিজেপির সরকার ছিল না। ২০২০ সালে এমএলএদের দলবদল ও উপনির্বাচনের কারণে বিজেপি সেখানে ফের ক্ষমতায় আসে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে নতুন দুটি রাজ্য তাদের দখলে এসেছে।
অ্যাসিড টেস্ট স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, তামিলনাড়ু, কেরালা এবং ইউনিয়ন টেরিটরি রাজ্য পন্ডিচেরি—এই পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন বিজেপির কাছে অ্যাসিড টেস্ট। দক্ষিণ ভারতের কেরালা চিরকালই হয় সিপিএম পরিচালিত এলডিএফ (লেফট ডেমক্রেটিক ফ্রন্ট) বা জাতীয় কংগ্রেস পরিচালিত ইউডিএফ (ইউনাইটেড ডেমক্রেটিক ফ্রন্ট)-এর দখলে থাকে। সেখানে বিজেপির ভোট বাড়লেও ক্ষমতায় আসার মতো পরিস্থিতি হয়নি।
তামিলনাড়ুতে এআইডিএমকের সঙ্গে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরে বিজেপির জোট হয়। সেখানে অতীতে কোনো জোটই বিজেপির জন্য বিশেষ লাভজনক হয়নি। এবারও পরিস্থিতি বলছে, জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএর ঝুলিতে যেতে চলেছে তামিলনাড়ু। পশ্চিমবঙ্গে ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর বিধানসভা নির্বাচনের মুখোমুখি মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ১৮টি আসন পেয়ে সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টকে পেছনে ফেলে বিরোধী দলের ভূমিকায় উঠে আসে বিজেপি। ফলে এই রাজ্যই এখন বিজেপির জন্য পাখির চোখ হয়ে উঠেছে।
রাজ্যসভার বাধ্যবাধকতায় বড় রাজ্যগুলোতে বিজেপির নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক কম। ভারতের পাঁচ বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশ (লোকসভার ৮০ আসন), মহারাষ্ট্র (৪৮), পশ্চিমবঙ্গ (৪২), বিহার (৪০) ও তামিলনাডু (৩৯)। এর মধ্যে একমাত্র উত্তর প্রদেশেই বিজেপি এককভাবে ক্ষমতায়। তামিলনাড়ু ও বিহারে এনডিএ জোট ক্ষমতায়। মহারাষ্ট্রে জাতীয় কংগ্রেস, এনসিপি, শিবসেনার জোট এবং পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস। বড় রাজ্যে ক্ষমতায় না থাকলে সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় শক্তি বাড়ে না। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আসে না। বিহার ও তামিলনাড়ুতে এনডিএর শরিক দল শক্তিশালী। বিহারে ২০২০ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ জিতলেও গতবারের তুলনায় আসন অনেক কমেছে। রাজ্যসভা (ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ) ২৪৫ আসনের। সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে প্রয়োজন ১২৩ আসন।
এনডিএ জোটের দখলে রয়েছে ১১৮ আসন। এর মধ্যে বিজেপির ৯৫টি। অর্থাত্, সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় কোন বিল পাশের পর উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় বিজেপিকে সেটি পাশ করিয়ে আইনে পরিণত করতে গিয়ে অন্য রাজ্যের আঞ্চলিক দলগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। মানতে হচ্ছে শরিকি বাধ্যবাধকতাও।
শরিকি সমস্যা এনডিএতে বিজেপির শরিক সঙ্গী ২৬ রাজনৈতিক দল। লোকসভায় তাদের সম্মিলিত সদস্যসংখ্যা ৩৩। লোকসভায় বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় শরিকি বাধ্যবাধকতা সেখানে নেই। রাজ্যসভায় শরিকদের ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। সেখানে তাদের দখলে ২৩ আসন। এই শরিকদের মধ্যে রয়েছে এআইডিএমকে (তামিলনাড়ু), জেডিইউ (বিহার), লোক জনশক্তি পার্টি (বিহার)-এর মতো দল। ১৩টি শরিক দলের লোকসভা বা রাজ্যসভায় এমপি নেই। তবে তাদের হাতে রয়েছে বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভার কিছু আসন। ফলে জোট বাধ্যবাধকতা নিয়েই বিজেপিকে চলতে হচ্ছে। তামিলনাড়ুতে এনডিএ সরকার, কিন্তু সেখানে বিজেপির নিজস্ব কোনো এমপি বা এমএলএ নেই। বিহার বিধানসভায়ও শরিক দল জনতা দল (ইউনাইটেড) বেশ শক্তিশালী। মিজোরামে মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট, সিকিমে ‘সিকিম ক্রান্তি মোর্চা’র সরকার। দুটি রাজ্যেই বিজেপি ছোট শরিক। মেঘালয়ে এনপিপি, নাগাল্যান্ডে এনডিপিপির সরকারেও বিজেপি ছোট শরিক।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর শরিকি সমস্যা বেড়েছে। মহারাষ্ট্রে জোটের সঙ্গী শিবসেনা বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সঙ্গ ত্যাগ করে জাতীয় কংগ্রেসের ইউপিএ জোটে যাওয়ায় রাজ্যটি বিজেপির হাতছাড়া হয়। পাঞ্জাবের আকালি দল ছিল বিজেপির দীর্ঘদিনের সঙ্গী। কৃষি বিল ইস্যুতে তারাও ২০২০ সালে বিজেপির হাত ছাড়ে। ২০২২ সালে গোয়ায় বিধানসভা নির্বাচন। গত সপ্তাহেই সেখানকার গোয়া ফরওয়ার্ড পার্টি বিজেপি সঙ্গ ছেড়ে জাতীয় কংগ্রেসের হাত ধরেছে। পশ্চিমবঙ্গেও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা এনডিএ ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে। আসামেও নির্বাচন শুরুর আগে বোরো পিপলস ফ্রন্ট বিজেপির সঙ্গ ছেড়ে জাতীয় কংগ্রেসের জোটে যোগদান করেছে।
উলটো দিকে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটে রয়েছে ১২ শরিক। লোকসভায় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্যসংখ্যা ৫১, শরিক দলের ৫৬। মোট ১০৭। রাজ্যসভায় জাতীয় কংগ্রেসের ৩৬, শরিকদের ২৩। সব মিলিয়ে ৫৯। লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির গেরুয়া ঝড় অব্যাহত থাকলেও রাজ্যভিত্তিক বিধানসভা দখলের চিত্র বলছে, এখনো তাদের অর্ধেক ভারত জয় বাকি।
n লেখক : ইত্তেফাকের কলকাতা প্রতিনিধি