যদি কোনো সংক্রামক ভাইরাস (যেমন :কোভিড-১৯) বড় পরিসরে শ্বাস-প্রশ্বাসের ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়, যেটি খুব দ্রুতই নিচে পড়ে যায়, সেক্ষেত্রে সেই ভাইরাস থেকে নিজেদের রক্ষার কিছু নিয়ম অনুসরণ করা প্রয়োজন। যেমন :আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শে না আসা, উপরিতল পরিচ্ছন্ন রাখা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, ড্রপলেট ছড়ায় এমন দূরত্বের মাঝে মাস্ক ব্যবহার করা, শ্বাস-প্রশ্বাসে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং উচ্চ সুরক্ষাসম্পন্ন পোশাক পরা। এই সুরক্ষাবিধি কেবল তথাকথিত সূক্ষ্ম জলীয় কণাবাহিত সংক্রমণের জন্যই প্রযোজ্য। এ ধরনের নিয়মনীতির ক্ষেত্রে সংক্রমণ খোলা পরিবেশে কিংবা বদ্ধ পরিবেশে ঘটে কি না, সেটা আলাদা করার প্রয়োজন পড়ে না। যেহেতু সংক্রমণের বেলায় মাধ্যাকর্ষণের নিয়মনীতি উভয় ক্ষেত্রে একই হয়ে থাকে। কিন্তু যদি একটি সংক্রামক ভাইরাস প্রধানত বায়ুবাহিত হয়ে থাকে, তখন যদি কেউ সংক্রমিত ব্যক্তির নিঃশ্বাস, কথাবার্তা, চিত্কার, গান, হাঁচি-কাশি, কফ-থুতু দ্বারা নিঃসারিত জলীয় কণার সংস্পর্শে আসে, তখন তার সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বায়ুবাহিত নিঃশ্বাস নিঃসৃত ভাইরাস সংক্রমণের কার্যপ্রণালি সরাসরি দেখানো বেশ কঠিন ব্যাপার। সার্স কোভিড-২ (কোভিড-১৯ রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী) ভাইরাস প্রাথমিকভাবে বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়—এই ভাবনার সপক্ষে ১০টি প্রমাণ অবতারণা করা যায়। সেগুলো নিচে বিবৃত হলো—
প্রথমত, মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাগুলো দৃঢ়ভাবে সার্স কোভিড-২ সংক্রমণের জন্য দায়ী, বাস্তবিকই এ ধরনের ঘটনাগুলোই মহামারির প্রাথমিক অনুঘটক। এটা মানুষের আচরণ এবং বিভিন্ন জনের সঙ্গে সংস্পর্শ, ঘরের আকার, বায়ু চলাচলের ওপর এই অনুঘটকগুলো নির্ভরশীল। যেমন গানের কনসার্ট, প্রমোদ জাহাজ, কসাইখানা, কেয়ার হোমসসহ অন্যান্য সেবামূলক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন স্থান থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর বিভিন্ন প্যাটার্ন রয়েছে। দেখা গেছে, দূরবর্তী অবস্থানে থেকেও সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। সেই ক্ষেত্রে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, ভাইরাসটি কেবল ড্রপলেট কিংবা যেসব বস্তুর ওপর ড্রপলেট পড়েছে, সেখান থেকে ছড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে—ভাইরাসটি অতি ক্ষুদ্র কণায় ভেসে দূরবর্তী স্থানে গিয়েও সংক্রমণ ঘটিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কোয়ারেন্টিন হোটেলে থাকা ব্যক্তিরা যারা কাছাকাছি রুমে অবস্থান করেছেন কিন্তু কেউ কারো নিকটে আসেননি, তাদের ক্ষেত্রে দূরবর্তী সংক্রমণের বিষয়টি প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।
তৃতীয়ত, উপসর্গবিহীন কিংবা মৃদু উপসর্গ রয়েছে এমন ব্যক্তি যারা হাঁচি-কাশি দেয়নি, তারা সারা বিশ্বের মোট সংক্রমিত হারের কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ থেকে শুরু করে ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত সার্স কোভিড-২ ভাইরাস সংক্রমণের জন্য দায়ী। এই বিষয়টিই সারা বিশ্বে সার্স কোভিড-২ ভাইরাস সংক্রমণের প্রধান কারণ, যেটি প্রধানত সংক্রমণের বায়ুবাহী রূপটির সমর্থন দেয়। সরাসরি হিসাব বা পরিমাপ দেখাচ্ছে যে, কথাবার্তা হাজার হাজার ক্ষুদ্রকণা এবং কিছু বড় ড্রপলেট উত্পাদন করছে, যেটি সংক্রমণের বায়ুবাহী রূপটিকে সমর্থন দেয়।
চতুর্থত, সার্স কোভিড-২ ভাইরাসের সংক্রমণ বাইরে কিংবা খোলামেলা পরিবেশের চাইতে বদ্ধ ঘরে বেশি হয় এবং যেসব আবদ্ধ জায়গায় বায়ু চলাচলের সুবিধা রয়েছে, সেখানে সংক্রমণের হার কম। উভয় পর্যবেক্ষণেই সংক্রমণ যে প্রধানত বাতাসের মাধ্যমেই হয়ে থাকে, সে বিষয়টিকেই সমর্থন করে।
পঞ্চমত, স্বাস্থ্যসেবা সংস্থাগুলোতে নসোকমিয়্যাল সংক্রমণের বিষয়টি উঠে এসেছে, যেখানে কঠোরভাবে সংস্পর্শে না আসা এবং ড্রপলেট না ছড়ানোর ব্যাপারে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, সেখানে পারসোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট বা পিপিই এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল, যেটি ড্রপলেট সংক্রমণ ঠেকাতে সক্ষম, কিন্তু অ্যারোসল বা ক্ষুদ্র কণা থেকে নিরাপদ নয়।
ষষ্ঠত, দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে সক্ষম এমন সার্স কোভিড-২ ভাইরাস বাতাসে শনাক্ত হয়েছে। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে যে, সার্স কোভিড-২ ভাইরাস বাতাসে প্রায় তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সংক্রমণ ঘটাতে পারে। যেসব রুমে কোভিড-১৯ রোগীরা ছিলেন, সেসব রুমের বাতাসে দীর্ঘস্থায়ী সার্স কোভিড-২ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তির গাড়ির বাতাস পরীক্ষা করেও ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। যদিও অন্যান্য অনেক গবেষণায় বাতাসে দীর্ঘস্থায়ী সার্স কোভিড-২ ভাইরাস শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এটা অনুমিতভাবেই। বায়ুবাহী ভাইরাস সুনির্দিষ্ট করা টেকনিক্যালি বেশ চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। কারণ কিছু কিছু নিশ্চিতকরণ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে ক্ষুদ্রকণা সংগ্রহের ক্ষেত্রে, নমুনা সংগ্রহের সময় ভাইরাল ডিহাইড্রেশন কিংবা ভাইরাল ড্যামেজের ঘটনা ঘটে, যেটি ভাইরাসের স্থায়িত্ব নষ্ট করে দেয়।
সপ্তমত, সার্স কোভিড-২ চিহ্নিত করা হয়েছে পরিশোধক বাতাস এবং কোভিড-১৯ রোগীদের হাসপাতালের গমনপথেও। এসব স্থানে প্রবাহিত বাতাসের মাধ্যমে যে কেউ সংক্রমিত হতে পারে।
অষ্টমত, গবেষণায় দেখা গেছে, খাঁচার মধ্যে থাকা সংক্রমিত প্রাণীর কারণে পৃথকভাবে অপর খাঁচায় থাকা সুস্থ প্রাণী সার্স-কোভিড-২ দ্বারা সংক্রমিত হয়েছে। পর্যাপ্ত বাতাস নির্গত থেকে তা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
নবমত, সার্স-কোভিড-২ যে বায়ুবাহিত হয়ে সংক্রমণ ছড়ায় না, আমাদের জানামতে, এ ব্যাপারে কোনো শক্তিশালী বা সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো গবেষণা বা প্রমাণ নেই। কোনো মানুষ যখন সংক্রমিত মানুষের সংস্পর্শে আসে, তখন সে সার্স-কোভিড-২-এর সংক্রমণ থেকে মুক্তও থাকতে পারে। তবে এই পরিস্থিতি কতগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। যেমন—সংক্রমিত ব্যক্তির মাঝে নির্গত বাতাসের পরিমাণ ও মাত্রাগত তারতাম্য দেখা দিলে। ভিন্ন পরিবেশ যেমন বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকলেও সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকা যায়। ব্যক্তিগত ও পরিবেশগত ভিন্নতার কারণে প্রাথমিকভাবে হালকা সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। উল্লেখ্য, ঘরে এবং কম বায়ু চলাচলের কোলাহলপূর্ণ এলাকায় সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে বেশি পরিমাণে ভাইরাস ছড়ায়। প্রবাহিত বাতাসের তারতাম্যের কারণেও সার্স-কোভিড-২-এর সংক্রমণের মাত্রা পরিবর্তিত হয়। এই ভাইরাসের রিয়েলিটি অরিয়েন্টেশন কম। প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে হামের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ১৫। বিশেষ করে গড়পড়তা রিয়েলিটি অরিয়েন্টেশন হলেও এ কথা বলা যায় না যে, সংক্রমিত ব্যক্তি উঁচু মাত্রার ভাইরাস ছড়ায়। তবে কোভিড-১৯-এ অতিমাত্রায় রিয়েলিটি অরিয়েন্টেশনের প্রমাণ আছে।
দশমত, সংক্রমণের অন্যান্য পথপরিক্রমার প্রমাণও সীমিত। অধিকাংশ সময় ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের কারণে মানুষের মাঝে এর সংক্রমণের পথ সহজ হয়ে যায়। একজন সংক্রমিত ব্যক্তির কাছ থেকে সামাজিক দূরত্বে অবস্থান করলে সংক্রমিত হওয়ার সুযোগ কম। পরিশেষে আমরা বলতে পারি, সার্স-কোভিড-২ ‘বাতাসবাহিত’ হওয়ার পেছনে শক্তিশালী যুক্তি ও প্রমাণ রয়েছে। যদিও অন্যান্য পথেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে, তবে বাতাসবাহিত পথই বেশি প্রভাবশালী। জনস্বাস্থ্য কমিউনিটির উচিত এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ ক্ষেত্রে কালক্ষেপণের কোনো অবকাশ নেই।
ল্যানসেট থেকে অনূদিত