সেদিনের আকাশটাও অন্যরকম ছিল। শীতের দিনেও প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কাতর হতে হয়নি। ক্যাম্পাসটাকে দেখে মনে হচ্ছিল অন্যরকম এক সাজ সাজ রব। আজ যে রঙের দিন। আজ বিদায়ের দিন। সাদা ধবধবে টি-শার্টে কাছের মানুষগুলোর লেখায় ভরে গেছে। আজ লেখালেখির লগ্ম, রঙের খেলা নাকি বিদায়ের করুণ সুর! কেউ একজন লিখেছে:“তোর জন্য একটা ছেলে আজও ভীষণ একা”। এভাবেই প্রিয়জনদের সাদা টি-শার্টে লিখে দিচ্ছিল মনের সব কথাগুলো। বলছিলাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ৭ম ব্যাচের (বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ম ব্যাচ) র্যাগ ডে’র কথা।
বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই এ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের চোখে ঘুম নেই। চলছে জোর প্রস্তুতি। কিভাবে অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার বেশি জমজমাট আয়োজন করা যায়। সবাই একই রঙের টি-শার্ট, ছেলেরা একই রঙের পাঞ্জাবি। মেয়েরা একই রঙের থ্রি-পিস। শুধু এই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা ছিল না। বিভাগের অন্যান্য ব্যাচের শি্ক্ষার্থীরাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিজেদের প্রতিভার জানান দিতে অনুশীলনে ব্যস্ত ছিল।
অবশেষে চলে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন! সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছ ভাস্কর্যের সামনে থেকে বিভাগের চেয়ারপার্সন ড. নিসতার জাহান কবিরের নেতৃত্বে বিভাগের সকল শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে এক বর্ণাঢ্য র্যালী পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে। র্যালীর সাথে ছিল পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ফুলে সজ্জিত ঘোড়ার গাড়ি। সাউন্ডবক্সে বেজেছিল গান। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে গিয়ে শেষ হয় র্যাগডে’র এই র্যালী। তারপর প্রধান ফটকের সামনে গানের সাথে তাল মিলিয়ে ফ্ল্যাশমব করেন স্নাতক শেষ করা বিদায়ী শিক্ষার্থীরা। সাথে সাথে চলতে থাকে রঙের খেলা। একজন আরেকজনকে রঙ মাখিয়ে নানান রঙে রাঙিয়ে দেন। আনন্দের নাকি বেদনার উত্সব দেখে বোঝার উপায় নেই। ফ্ল্যাশমব শেষে একটু বিরতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে চলে স্মৃতিচারণ পর্ব। এসময় একেকজন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগে আপ্লুুত হয়ে পড়েন। কিছু সময়ের জন্য পুরো মিলনায়তনে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। জুনিয়র ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বিদায়ী ভাইয়া-আপুদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করে। স্মৃতিচারণ পর্বে শিক্ষকদের মধ্যে থেকে উপস্থিত ছিলেন সহকারী অধ্যাপক রাইসুল ইসলাম, প্রভাষক মিঠুন মিয়া ও মিনহাজউদ্দীন প্রমুখ। এ সময় বিদায়ী শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হয় তাদের ছবিসংবলিত মগ ও ক্রেস্ট। এরপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কী ছিল না এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে? নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি, কৌতুক, র্যাম্প শো সবই ছিল জমজমাট এই আয়োজনে। পুরো মিলনায়তন ভর্তি দর্শক ছিল পুরোটা সময় জুড়েই। কেউ গান আবার কেউ নাচ নিয়ে মঞ্চে হাজির হয়। একের পর এক চোখ ধাঁধানো পারফরমেন্সে করতালিতে মুখর হয়ে উঠে পুরো মিলনায়তন। আনন্দ করতে করতে পশ্চিম আকাশে অস্তায়মান সূর্য জানান দিচ্ছিল এখন যাবার পালা। সবশেষে সবাই যেনো বলছে: ‘বিদায়, ভালো থেকো বন্ধু। তোর জন্য একটা ছেলে আজও ভীষণ একা’। ছেলেটিও অশ্রুসিক্ত লোচনে আর নির্বাক কণ্ঠে বলে উঠে যেনো: ‘দেখা হবে বন্ধু চাপা কোনো অভিমানে। দেখা হবে বন্ধু কারণে বা অকারণে...।’