দেশে করোনা ভাইরাসের টিকা যে হারে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তাতে মজুত টিকা দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া থেকে কেনা টিকার পরের চালান কবে আসবে তা অনিশ্চিত। নতুন টিকা না এলে টিকাদান কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে চুক্তির শর্তানুযায়ী বাকি টিকা পেতে ভারতকে চাপ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সরকারের পক্ষে টিকা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান পাপন এমপি। তিনি বলেছেন, ‘সরকার অগ্রিম টাকা দিয়ে যে টিকা কিনে নিয়েছে এটা আটকানোর কোনো সুযোগ নেই। অন্য দেশের সঙ্গে কী হলো তা আমার জানার দরকার নেই। আমরা আমাদের টাকা দিয়েছি। টাকা নিয়ে দেবে না, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। সরকারকে টিকা পাঠানোর কথা জোরালোভাবে বলতে হবে ভারতের কাছে।’ গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার পর সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
এদিকে চুক্তি অনুযায়ী সিরাম ইনস্টিটিউটের উত্পাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড টিকা বাংলাদেশে রফতানি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে এক বার্তায় ভারত সরকার বলেছে, আমরা চুক্তির শর্ত রক্ষার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছি। সংকট নিরসনে বাংলাদেশে কোভ্যাকসিনের যৌথ-উত্পাদন শুরুর সুযোগ আছে বলেও ভারত মনে করে। গতকাল ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন এক কূটনৈতিক বার্তায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ কথা জানিয়েছে।
প্রসঙ্গত, দেশে গত ৭ ফেব্রুয়ারি গণ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। ৮ এপ্রিল থেকে টিকার দ্বিতীয় ডোজ প্রদান শুরু হয়। সিরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ৩ কোটি ডোজ করোনা ভাইরাসের টিকা কিনতে গত বছরের নভেম্বরে চুক্তি করে বাংলাদেশ। ঐ টিকা সরবরাহের দায়িত্বে আছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে ছয় মাসে তিন কোটি ডোজ টিকা পাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের। জানুয়ারিতে ৫০ লাখ ডোজ দেশে এলেও বিপুল চাহিদা আর বিশ্বজুড়ে টিকার সংকটের মধ্যে ফেব্রুয়ারির চালানে বাংলাদেশ মাত্র ২০ লাখ ডোজ হাতে পায়। এরপর আর টিকা আসেনি। এর বাইরে ভারত সরকার তিন দফায় উপহার হিসেবে দিয়েছে মোট ৩৩ লাখ ডোজ টিকা।
নাজমুল হাসান পাপন আরো যা বললেন
ভারতের কাছ থেকে আমরা কবে টিকা পাবো-সাংবাদিকরা জানতে চাইলে বেক্সিমকোর এমডি নাজমুল হাসান পাপন জানান, ‘এটা বলা খুবই কঠিন। যেটা বলা হচ্ছে, ওরা আমাদের ৫০ লাখ পুরো রেডি করে রেখে দিয়েছে। কোনো সমস্যা নেই। ওরা ওদের মিনিস্ট্রি অব এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্সের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করছে। গত মাসে ৫০ লাখ পাঠানোর কথা ছিল। ওরা দিয়েছে ২০ লাখ। এ মাসে এখনও দেয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সেকেন্ড ডোজের শর্টেজ হয়ে যাবে সামনে। এজন্য আমাদের এটা ইমিডিয়েট পেতে হবে। যেহেতু সিরাম ইনস্টিটিউট, ওদের সিইও ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর আমাদের লিখিতভাবে জানিয়েছে তাদের সরকার আটকে রেখেছে, ছাড়পত্র পাচ্ছে না, কাজেই আমি মনে করি আমাদের সরকারের চুপ করে থাকার কোনো কারণ নেই। সরকারকে ইমিডিয়েটলি বলা উচিত, এই ভ্যাকসিন আমি অগ্রিম টাকা দিয়ে কিনেছি। আমাদের দিতেই হবে। এটা জোরালোভাবে বলতে হবে। আনঅফিশিয়ালি, ফোনে একটু কথা বলা- এভাবে না। আমার মতে, শক্ত স্টেপ নিতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভারত বাংলাদেশের বন্ধু। এটা এখন দেখার সময় এসেছে। এত মিষ্টি মিষ্টি কথা শোনার দরকার নেই। আমরা দয়া চাই না। ন্যায্য পাওনা আমাদের ভ্যাকসিন, তা দিতে হবে।’
পাপন বলেন, ‘আমরা বেক্সিমকো সরকারকে ভ্যাকসিন এনে দিতে সহায়তা করেছি। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতি দেখছি তাতে ভ্যাকসিন বানানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না যাদের ফ্যাসিলিটিজ আছে তারা কেন এ ব্যাপারটা নিয়ে এগিয়ে আসছে না। একটা জিনিস বলতে পারি, এ বছর আমরা বেক্সিমকো স্বপ্ন দেখছি, লোকাল প্রোডাকশন ছাড়া কোনো পথ নেই এবং এমন কোনো ওষুধ নেই যেটা বাংলাদেশ বানাতে পারে না। তবে এখন পর্যন্ত বেক্সিমকোর পরিকল্পনা নেই। কারণ অন্যদের ফ্যাসিলিটিজ তো আছেই। তাদের বানানো উচিত। এখন আরেকটু সময় দিতে হবে। আর দুই মাসের মধ্যে দেখবেন প্রচুর ভ্যাকসিন চলে আসবে।’ তিনি জানান, ওয়ার্ল্ড মার্কেটে চারটি ভ্যাকসিন আছে যেগুলো অ্যাপ্রুভড। ফাইজার, জনসন অ্যান্ড জনসন, মর্ডানা ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা। আর কোনোটা অ্যাপ্রুভালের আগে আনা সম্ভব না।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের এমডি আরো বলেন, ‘আমি ক্লিয়ার করছি, এই ক্রাইসিস জুন পর্যন্ত থাকবে। জুনের পর কোনো ক্রাইসিস থাকবে না। আমাদের দেড় কোটি ডোজের টাকা দিয়ে দিয়েছি। যেটা আমাদের মের মধ্যে পাওয়ার কথা। কিন্তু আমরা ৭০ লাখ ডোজ পেয়েছি। আমাদের ৮০ লাখ বাকি। এ ৮০ লাখ পাওয়ার পর যদি মনে করি ওদের থেকে আর নেব না, তখন অন্য অপশনে যাব। যেটা সরকার পে করেছে, সেটা জনগণের টাকা। এটা আটকানোর অধিকার কারো নেই। যত ক্রাইসিস থাকুক না কেন। ভারত সরকারও তাদের (সিরাম) অগ্রিম টাকা দেয়নি। আমরা অগ্রিম টাকা দিয়ে ওদের বুক করেছি। গত বছরের অক্টোবরে বুক করেছি।’
ভারত সরকারের বার্তায় যা রয়েছে
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ভারতীয় হাইকমিশনের বার্তায় আরো বলা হয়েছে, সিরাম ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য বিশিষ্ট টিকা উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে আরো বেশি পরিমাণে টিকা উত্পাদনের সাহায্যে ভারতীয় সংস্থাগুলোর স্বাক্ষরকৃত চুক্তির শর্ত পূরণের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের চেষ্টা চলছে। সমগ্র বিশ্ব জানে যে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো এই টিকা তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। তাই চুক্তিবদ্ধ টিকা সরবরাহ স্থগিত রাখতে হচ্ছে এবং এটিই উন্নয়নশীল দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা।
বার্তায় বলা হয়েছে, গত চার মাস ধরে ভারত এবং বাংলাদেশ একযোগে কাজ করে চলেছে বাংলাদেশের জনগণের কাছে টিকা নিরাপদ ও সহজলভ্য করার জন্য। বাংলাদেশের জনগণকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার বিষয়টি তারই প্রমাণ। এছাড়া ঢাকাস্থ আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি) এবং ভারত বায়োটেক ২০২০ সালের ডিসেম্বরে কোভ্যাকসিনের চূড়ান্ত পর্যায়ের ক্লিনিকাল পরীক্ষার জন্য একটি চুক্তি সম্পাদন করে। তবে চূড়ান্ত পরীক্ষণের জন্য এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোভিশিল্ডের তুলনায় কোভ্যাকসিন ৮০ শতাংশেরও বেশি কার্যকারিতা দেখিয়েছে। ভারতের প্রস্তাবনা অনুসারে যদি একাধিক প্রস্তুতকারককে ব্যবহার করে বাংলাদেশে কোভ্যাকসিনের যৌথ-উত্পাদন শুরু হয়, তবে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ টিকাগুলো আমাদের দেশে এবং বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোতেও সরবরাহ সম্ভব হতো। এতে প্রতিটি বাংলাদেশিও গর্বিত হবে। তবে সেই সুযোগটি এখনো হারিয়ে যায়নি, যদি উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।