সভ্যতার উৎকর্ষতার ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি মানব সমাজের হাল-হকিকত এবং বিবর্তন পর্যালোচনা শেষে স্বাভাবিকভাবেই প্রতীয়মান হয় যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, নিরহংকার, আমিত্ব পরিহার, বিনয়ী, সদাচরণ এসবই কিনা দার্শনিক ভিত্তি হিসেবে পেছন থেকে ঐক্য সংহতি ও অগ্রগতিতে রসদ যুগিয়েছে। আমাদের দেশের মানুষের মাঝে ও এসব গুণাবলির অস্তিত্ব ও চর্চা আবহমানকাল হতেই লালিত ও বিকশিত হয়ে আসছে। কিন্তু হালে শিক্ষিত ও রুচিশীল গোষ্ঠী বলে দাবিদার কৌলিন সমাজে এসব চর্চায় কোথায় যেন ছেদ পড়েছে। কেন এমন হচ্ছে? গলদ কোথায়? যেখানটায় একজন উচ্চশিক্ষিত সজ্জন রুচিশীল অমায়িক বন্ধুবৎসল শ্রদ্ধাশীল সহযোগিতা পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের মনোভাব নিয়ে একসাথে এগিয়ে যাওয়ার কথা। নয়া জামানায় অভিযোজন ঘটিয়ে বিশ্ব দরবারে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়া সময়ের দাবি। সেখানটায় কিনা বিপত্তি। এসব কিসের আলামত? একবার ও কি ভেবেছি?
সমাজ কাঠামোতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার বিকল্প নেই।আমরা যদি সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক কে মানবদেহের সাথে তুলনা করি তাহলে সহজেই অনুমেয় ও বোধগম্য হয় যে, দেহের কোথা ও সংকট অস্থিরতা ও বিঘ্ন ঘটলে যেমন সমগ্র শরীর ও মনে এর প্রভাব দৃশ্যমান। ঠিক তেমনি সমাজ ব্যবস্থার কোন অংশে যদি অস্থিরতা অস্বাভাবিকতা মর্যাদা ও ভূমিকার সংকট ও অসামঞ্জস্যতা থাকে তাহলে ওই সমাজে স্বাভাবিকভাবেই জৌলুস শ্রী হারিয়ে ভঙ্গুর হতে বাধ্য। প্রশ্ন হল, আমরা কি তা চাই? সমাজে বড়ত্বের লড়াইয়ে সবাই মত্ত। বিশেষত শিক্ষিত সমাজ। অথচ এসব তো হওয়ার কথা ছিল না?
দেশের সংবিধানের ২১(২) এ বলা আছে সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। দেশের কর্মে নিয়োজিত সকলেরই একমাত্র দায়িত্ব জনতার সেবকের ভূমিকায় নিজেদেরকে সোপর্দ করা। কেননা সংবিধানে আর ও বলা আছে ৭(১) অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু বাস্তবে হাল জামানার বিভিন্ন ক্রিয়া-কলাপে আমরা কি দেখতে পাই। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে ও সরকারি কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিদের কে কর্মচারী অর্থে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যা কিনা ২০১৮ সালে সরকারি চাকরি-বিধির প্রথম অধ্যায়ের ১৬ ধারায় ও সরকারি কর্মচারী অর্থ লেখা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোন ব্যক্তি। বিপত্তি দেখা দিয়েছে তখন ই যখন সংবিধান এবং আইনকে পাশ কাটিয়ে কর্মচারীরা নিজেদেরকে কর্মকর্তা ভাবতে শুরু করেছে। কোন এক্তিয়ারে বা ক্ষমতার বলে তারা এসব করছে?এসবের চর্চার ফলেই বড়ত্বের সংকট কর্তৃত্ব ক্ষমতা পারস্পরিক অশ্রদ্ধাবোধ সহ নানা নেতিবাচক উপাদানের জন্ম হয়েছে।
আজকাল আমরা কি দেখছি? সিভিল সার্ভিসের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বয়স অবধি প্রকৌশলী চিকিৎসকদের কৌলিন ক্যাডারে নিযুক্তির অভিলাষ ও আসক্তি।অথচ দেশসেরা মেধাবীরা ছাত্রজীবনে প্রতিযোগিতা করে শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে জীবনের লক্ষ্য স্থির করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। অথচ বছর কয়েকের ব্যবধানে এরা ই কিনা মোহভঙ্গের ট্রমায় আসক্ত। কেন এমন হচ্ছে? আমরা কি এসব মেধাবীদের যোগ্য মর্যাদা ও সম্মান দিতে পারছি?এসব প্রশ্ন আজ চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে।
সমাজ আজ ভিআইপি থাবায় পিষ্ট। শিক্ষিত সমাজের সবাই ভিআইপি হতে চায়। যার খেসারত গুনতে হচ্ছে এদেশের আমজনতাকে। এ দেশে মাওলানাদের নামের ডানে-বামে বাহারি লকব ব্যবহারের হীন প্রতিযোগিতা, দামি গাড়িতে যত্রতত্র পতাকার ব্যবহার, হাল জামানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বড়কর্তার স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণার আসক্তি,ফেরিঘাট আটকে যুগ্ম-সচিবকে প্রটোকল দেওয়া,স্থানীয় কর্মচারীকে দিদি ডাকায় মাছের থালায় লাথি প্রদান, এক কর্মচারীর মোবাইল ফোন পানিতে উদ্ধারে ছয়জন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরির উপস্থিতি, বড়ত্বের তকমা নিয়ে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের জোরে আইন অমান্য করে রাস্তার উল্টোপথে গমন এসব তো রোজকার বয়ান।সভ্য সমাজে কি এসব হওয়ার কথা ছিল? এসব বিষয়ে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনায় পরিষ্কার বিবৃতি আছে যে, রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কেউ ভিআইপি নন। অথচ আমরা কি দেখছি? কর্মকর্তার পাশাপাশি তার পরিবার-পরিজন এবং চারপাশের জনরা ও ভিআইপির কৃতিত্বের তকমায় নিজেদেরকে সমাজে আলাদা ভাবতে চায়।
কেনো এমন হচ্ছে? ভাবার সময় এসেছে। এ থেকে পরিত্রাণের রাস্তা বের করতে না পারলে জাতি হিসেবে আমাদেরকে বিশ্ব দরবারে বেগ পোহাতে হবে। ভারত ও বাংলাদেশে সিভিল প্রশাসনে প্রবেশের যে আসক্তি যা কিনা উন্নত সমাজে প্রায় অনুপস্থিত। মানুষের মর্যাদা নির্ণীত হওয়ার কথা ছিল তার দক্ষতা যোগ্যতা বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের গভীরতা এবং প্রায়োগিক ক্ষমতার উপর।যা ভর করে সমাজ-সংসারে সামনের পানে আগানোর চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।অথচ আমরা কি পারছি যোগ্যতা ও দক্ষতা কে সম্মান ও সমীহ করতে? এর দায় আমাদের এবং সবার। আমরাই কিনা বিয়ের পাত্র খুঁজতে তার আয় ও কর্তৃত্ব খুঁজি। অথচ একবার ও ভাবি না এর উৎস কোথায়? পারিবারিক পরিমণ্ডলে আদব-কায়দা শ্রদ্ধাবোধ চর্চার কথা ছিল। যার অনুপস্থিতিতে দেখা যায় অগ্রজরা ও কতিপয় কর্মকর্তার কাছ থেকে সৌজন্যমূলক আচরণ পায়না। ১৬তম বিসিএসের কলেজের প্রিন্সিপালের সাথে ৩৩তম বিসিএসের এর সাম্প্রতিক আচরণ এবং আস্ফালন ই হীনতা সাংস্কৃতিক দৈণ্যতা আমিত্ব দাম্ভিকতা কে সামনে নিয়ে এসেছে।
সমাজের এ অচলায়তন সহজেই ভেঙ্গে ফেলা যাবে না। তবে এ থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে একসময় দেবালয় ও রক্ষা পাবে না। মজ্জাগত এ প্রবণতা থেকে যদি সমাজকে মুক্ত করতে হয় তাহলে সর্বাগ্রে যোগ্যতার মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহযোগিতার মানসিকতা পোষণ করতে হবে।বিশ্বাস করতে হবে যে,সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ পারস্পরিক নির্ভরশীল। একা চলতে গিয়ে ই কথিত শ্রেণি সবার রোষানলে পড়েছে। পারিবারিক আবহে যদি নৈতিকতা ভালোবাসা শ্রদ্ধা বোধ চর্চিত হয়, তাহলে সমাজ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।ক্যাডার সার্ভিসে প্রবেশে বেতন ও মর্যাদা সমান থাকা সত্ত্বে ও সময়ের ধারাবাহিকতায় নানা বৈষম্য পারস্পরিক অবিশ্বাস ও আস্থার সংকটের জন্ম দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যদি সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত স্ব ক্যাডার থেকে নিযুক্তির ব্যবস্থা থাকে তাহলে, আমরা মনোভাবে প্রাণিত হয়ে পারস্পরিক কল্যাণে কাজ করার নানা পথ খুলে যেতে পারে।মোহ আসক্তির চাদরে আচ্ছাদিত না থেকে জাতি হিসেবে সবাই যদি সহিষ্ণু শ্রদ্ধাশীল বিনয়ী হই তাহলে এ সংকটের অনেকাংশ হ্রাস পাবে। সর্বোপরি সবাই যদি মনেপ্রাণে সংবিধানের স্পিরিটকে ধারণ লালন ও চর্চা করি তাহলে বড়ত্ব দেখানোর জায়গা কোথায়? কারণ আমাদের সব কর্মই তো আবর্তিত হওয়ার কথা জনগণের কল্যাণ ও উন্নতির মানসে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কেবল সেবক মাত্র।এ ধারণার বিকাশ ও ব্যপ্তির মাঝে ই কল্যাণ নিহিত। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আপনাকে সমাজে বড় হতে হলে আগে ছোট হতে হবে কারণ বিনয় সহনশীলতা ই পারে আমাদেরকে বড় করতে।আস্থা ও বিশ্বাস, অমানিশার এ ঘোর কেটে বড়ত্বের সংকট মোচন করে আমরা সামনে আগাবো ই।
লেখক: শিক্ষক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ইত্তেফাক/জেডএইচডি