সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশি নারী প্রবাসীদের নির্যাতনের খবর নতুন নয়। কিন্তু সম্প্রতি, দেশটি থেকে ১২৮ জন নির্যাতিত শ্রমিক ফেরত আসার ঘটনায় সেটি গণমাধ্যমে আবারও নতুন মোড় দিয়েছে। দেশটি থেকে ফেরত আসা নির্যাতিত কর্মীদের বেশিরভাগই নারী শ্রমিক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বিষয়ে এখনই যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারীদের শ্রমবাজার নষ্ট হয়ে যাবে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে গৃহপরিচারিকার কাজ করতে জর্ডান গিয়েছিলেন মৌসুমি আক্তার। সম্প্রতি তার মৃতদেহ ফিরেছে বাংলাদেশে। ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা ছিল স্ট্রোক করে মারা গেছেন মৌসুমি। পরিবার বলছে, নির্যাতিত হয়ে মারা গেছেন তিনি। মৌসুমির চাচা মোহাম্মদ ইমরান খান বলেন, মৌসুমির মৃতদেহে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ২০ বছরের মেয়েটির কোনো রোগ ছিল না বলেও দাবি তার। তাই মৌসুমি স্ট্রোক করে কেন মারা যাবেন, এ প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তিনি সরকারের কাছে তার ভাতিজির আরেকটি ময়না তদন্ত করানোর দাবিও জানিয়েছেন। দেশে শ্রমিকদের মৃতদেহ ফিরলেই প্রত্যেকেরই দ্বিতীয় দফা ময়না তদন্তের জোর দাবি জানান তিনি। ওয়েজ আনার্স বোর্ডের দেওয়া তথ্য বলছে, ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত প্রবাসে মারা যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের অর্ধেকের বেশি স্ট্রোকে মারা গেছেন।
‘ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম’-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রতি মাসে গড়ে ২০০ করে নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। সৌদি আরবের রিয়াদ এবং জেদ্দায় সেফ হোমগুলোতে গড়ে ২০০ জন করে নারী শ্রমিক আশ্রয় নিয়েছেন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান এক গণমাধ্যমকে জানান, গত তিন বছরে কমপক্ষে পাঁচ হাজার নারী সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। এই নারীদের একটি বড় অংশ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার। তিনি বলেন, ২০১১ সালে ফিলিপাইন্স ও শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশ সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দেয়। তার প্রধান কারণ ছিল নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন। ফিলিপাইন্সের একটি প্রতিনিধি দল সৌদি আরবে গিয়ে সরেজমিন তদন্ত করে নির্যাতনের প্রমাণ পেয়ে সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দেয়।
২০০৮ সাল থেকে সৌদি শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ ছিল। সে কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠাতে রাজি হয়। কিন্তু বাংলাদেশ তখন ভাবেনি যে অন্যরা যখন সৌদি আরবে নির্যাতনের কারণে নারী শ্রমিক পঠানো বন্ধ করেছে, আমরা কেন পাঠাচ্ছি। নির্যাতন যাতে না হয় সেরকম কোনো পদক্ষেপের কথাও বলেনি বাংলাদেশ। তিনি বলেন, সম্প্রতি যারা ফিরে এসেছেন, তাদের মধ্যে যৌন নির্যাতনের কারণে অন্তঃসত্ত্বা নারীও আছেন। এছাড়া শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অনেকেই। আরেকজন মেয়েকে আমরা পেয়েছি যে সৌদি আরবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। এখন তার বাবা তাকে আর পরিবারে ফেরত নিতে রাজি নন। আমরা বাধ্য হয়ে তাকে শেল্টার হোমে পাঠিয়েছি।
২০১৫ সাল থেকে ২ লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক পাঠানো হয় সৌদি আরবে। তাদের মধ্যে নির্যাতনসহ নানা করণে ৪০ হাজারের মতো নারী শ্রমিক সেখান থেকে ফেরত এসেছেন। সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর সারোয়ার আলম গণমাধ্যমে বলেন, রিয়াদ এবং জেদ্দায় আমাদের দুটি ‘সেফ হোম’ আছে। যেসব নারী কর্মী বিপদে পড়েন, তাদের আমরা সেখানে আশ্রয় দেই। এরপর তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি। দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। এখানো সেখানে ৪০ জনের মতো নারী কর্মী আছেন।
সম্প্রতি বিভিন্ন ‘শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের’ শিকার হয়ে আরও ১২৮ বাংলাদেশি নারী ও পুরুষ শ্রমিক সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে অধিকাংশই গৃহকর্মী। নির্যাতিতদের মধ্যে কয়েকজন অসুস্থ নারী কর্মীকে বিমানবন্দর থেকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রায় দেড় হাজার নারী গত বছর সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন। সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত সৌদি আরব থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে নারী গৃহকর্মীদের ফিরিয়ে নিয়ে এসে ধীরে ধীরে দেশে কর্মসংস্থান বাড়ানো। তাহলে একদিকে যেমন এসব আর্তনাদ কমে আসবে, তেমনি দেশীয় কর্মসংস্থানে এসব নারীরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতেও পারবেন।