গড়ে উঠুক বই পড়ার অভ্যাস

যুগ যুগ ধরে বই মানুষের সর্বোত্তম বন্ধু হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বই এমন এক সত্তা যার দ্বারা ব্যক্তি জ্ঞানের রাজ্যে অবাধে প্রবেশ ও বিচরণ করতে পারে। বই পড়ার মাধ্যমে প্রতিটা মানুষের একেকটি কল্পনার রাজ্য তৈরি হয়, যে রাজ্যের ভাঙাগড়ার কারিগর শুধু সেই ব্যক্তিটি। মননশীলতা, সৃজনশীলতার বিকাশ ও চিন্তাজগতের দ্বার উন্মোচনের মোক্ষম হাতিয়ার বই।

প্রতিটা সফলতার গল্পের পেছনে, মেধা ও সুপ্ত প্রতিভার যথাযথ বিকাশ সাধনে, নতুন সৃষ্টিকর্মের রহস্য উদ্ঘাটনে সর্বোপরি জ্ঞান নামক সত্য আবিষ্কারের ক্ষেত্রে বই অনুবন্ধক হিসেবে ভূমিকা রাখে। হাজার বছরের রচিত ইতিহাসও আমাদের সেই সাক্ষ্যই দেয়। জগদ্বিখ্যাত অনেক সফল ও জ্ঞানী ব্যক্তিরাই বই পড়ে নিজেদের অভিজ্ঞতার ঝুলিকে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর করার চেষ্টা করতেন। অথচ আমাদের দেশে কালের পরিক্রমায় বই পড়ার হার জ্যামিতিক হারে কমছে। একটা সময় ছিল শিশু, কিশোর, তরুণ, বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষ বই পড়তেন তাদের অবসর কাটাতে, মনের খোরাক জোগাতে। আমরা জাতি হিসেবে যত উন্নতির দিকে ধাবমান হচ্ছি, বই পড়া, কর্মস্পৃহা, চিন্তাশীলতার মতো সত্ গুণগুলো ততই হারাচ্ছি।

বই পড়ার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির মানসিক বিকাশ ঘটে, জ্ঞানার্জনের পথ সুগম হয়, ব্যক্তির ভেতরের সত্তাকে জাগিয়ে তুলে, অজানাকে জানার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। বই পড়া মানুষকে কাজের প্রতি মনোযোগী করে তুলে, মনের খোরাক জোগায়, কল্পনা জগতের পরিধিকে বৃহত্ করে গড়ে তুলে, যুক্তিবুদ্ধি জোগায়। মূল্যবোধের যথাযথ বিকাশ ঘটাতে বই পড়ার বিকল্প নেই।

আমাদের দেশের একাংশ মানুষের ধারণা—তারা যা পড়েন, তা তাদের মনে থাকে না। একটি বই পড়লেই যে তার সব আমাদের মনে থাকতে হবে, বিষয়টি এমন না। প্রতিটা বই পড়ে আমরা নতুন শব্দ, নতুন তথ্য জানতে পারি। যা দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটায়, পরিশীলিত করে লেখার দক্ষতা বাড়ায়, পৃথিবীকে সুন্দরভাবে বুঝতে শেখায়। বই পড়ার মাধ্যমে মনের ভাবগুলো সুচারুরূপে প্রকাশ করতে শিখি আমরা প্রতিনিয়ত। নিজেদের অজান্তেই বই পড়ার মাধ্যমে আমরা আমাদের মননকে উন্নত করার দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়াটি সম্পাদন করে ফেলছি। এবার পঠিত অংশ মনে থাকুক আর নাই থাকুক।

আমাদের আশপাশে এখন বই পড়ুয়া মানুষের সংখ্যা খুবই নগণ্য। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, ই-টেকনোলজির বিস্তার আমাদেরকে সারাক্ষণ ব্যতিব্যস্ত করে রাখে, বই পড়ার মতো সময় এখন আমাদের হাতে থাকে না বললেই চলে। আমরা এখন বই পড়া থেকে অধিক গুরুত্ব দিই ফেসবুক, টুইটারের মতো সোশ্যাল মিডিয়াতে সময় দেওয়াকে। অথচ একটি সহনশীল ও মানবিক জাতি ও সমাজ গঠনে বই পড়ার বিকল্প নেই। বই পড়ার মাধ্যমে একজন মানুষের মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটে, সহনশীলতা-সহমর্মিতা-দায়িত্বশীলতা বাড়ে। আমাদের অঙ্গীকার হোক নিজে বেশি বেশি বই পড়ার ও অন্যকে বই পড়তে প্রেরণা দেওয়ার। বই পড়ার বিকল্প একমাত্র বই পড়াই হতে পারে। তাই বই পড়ার অভ্যাস গঠনে আমরা জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীসহ এধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে বই উপহার দেওয়ার প্রচলন করতে পারি। আসুন নিজেরা বই পড়ি যাতে করে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বইপড়ুয়া জাতি হিসেবে গড়ে উঠে একটি সুন্দর পৃথিবীর রূপকার হতে পারে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়