নতুন করে তিন মাসের জন্য প্রণোদনা চায় বস্ত্র ও পোশাক খাত

তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের শ্রমিকের বেতন পরিশোধের জন্য ফের চলতি এপ্রিল থেকে তিন মাসের জন্য নামমাত্র সুদে ঋণ চান উদ্যোক্তারা। গত বছরের ন্যায় ২ শতাংশ সুদে এই ঋণ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে গতকাল রবিবার পোশাক ও বস্ত্র খাতের তিন সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অপেক্ষাকৃত ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখা এবং শ্রমিকের বেতন পরিশোধের জন্য এ ঋণ চাওয়া হয়েছে। এর আগে গত বছরও করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় লকডাউন ঘোষণা এবং কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকার পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের জন্য শুরুতে ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জে তিন মাসের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার আওতায় ঋণ দেয়। পরে তা বেড়ে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এছাড়া ঋণ পরিশোধের গ্রেস পিরিয়ড (যে সময় থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয় না) বা মোরাটরিয়াম প্রথমে ছয় মাস থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে দেড় বছর করা হয়। এছাড়া সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে সরকারঘোষিত প্রণোদনা তহবিল থেকেও পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ পেয়েছেন।

চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করে বিজিএমইএর সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকের রপ্তানি কমে গেছে ব্যাপকভাবে। এ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের সংকটের মধ্যে রয়েছে। অর্থায়নের ব্যবস্থা না হলে ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানাগুলোতে বেতন-ভাতা নিয়ে বিশৃঙ্খলা লেগে যেতে পারে। এজন্য এপ্রিল, মে ও জুন মাসের জন্য আমরা ২ শতাংশ হারে সরকারের কাছে ঋণ চেয়েছি। এই টাকা পরে আমাদের রপ্তানি বিল থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে সমন্বয় করে নিতে পারবে। তিনি বলেন, পৃথিবীর সব দেশই উদ্যোক্তাদের রক্ষায় নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। বস্ত্র খাতের মিলমালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন ইত্তেফাককে বলেন, আজ (গতকাল রবিবার) অর্থ মন্ত্রণালয় ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছেও এ চিঠি পাঠানো হয়েছে।

চিঠিতে পোশাক ও বস্ত্র খাতের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়, আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য অনেক ক্রেতা নিজেদের দেউলিয়া গোষণা করার ফলে তাদের কাছ থেকে রপ্তানিকৃত পণ্যের বিপরীতে অর্থ পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে গেছে। রপ্তানি আদেশ বাতিল কিংবা স্থগিত ও নির্দিষ্ট সময়ে পেমেন্ট না পাওয়ায় পোশাক খাত নিদারুণ সংকটে রয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যয় পরিশোধ করা হতো ক্রেতার কাছ থেকে অর্থ পাওয়া এবং নগদ সহায়তা বাবদ প্রণোদনার অর্থপ্রাপ্তির পর। কিন্তু রপ্তানিমূল্য প্রত্যাবাসন না হওয়ার কারণে নগদ সহায়তার আবেদন করা যাচ্ছে না। আবার অনেক ক্রেতা ডিসকাউন্ট হারে মূল্য পরিশোধ করছে, যার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো তারল্য সংকটে পড়েছে।

করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ফের লকডাউনে গেছে। ফলে যেসব ক্রেতার কাছ থেকে অর্থ পাওয়ার কথা ছিল, তারাও তা পিছিয়ে দিচ্ছেন। চিঠিতে বলা হয়, আগামী ঈদের আগে বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধের জন্য রপ্তানিকারকদের ওপর প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। কিন্তু এ অর্থের জোগান দেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এজন্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। অবশ্য অর্থনীতিবিদেরা কেবল তৈরি পোশাক খাতকে না দিয়ে অন্যান্য খাতের জন্যও এ ধরনের সুবিধা দেওয়ার পক্ষে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ইত্তেফাককে বলেন, করোনার এই সময়ে অপেক্ষাকৃত ছোট উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি বিপাকে রয়েছেন। তাদের ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা দরকার। পোশাক খাতে সব উদ্যোক্তার হয়তো এ ঋণ দরকার নেই। যাদের দরকার তাদের সঠিক উপায়ে চিহ্নিত করে এই সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। আর এর বাইরে অন্যান্য খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য এই ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া দরকার।