সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে থাবা বসিয়েছে কোভিড-১৯। শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে সঙ্গে আসছে আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন। অবরুদ্ধ এই সময়ে যে ব্যাপারটিতে সবচাইতে বেশি পরিবর্তন এসেছে, তা হচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলোতে। দীর্ঘদিন ঘরে বন্দি থেকে বাবা-মা ও আপনজনের সঙ্গে সময় কাটানো হচ্ছে তাতে অবশ্য কোনো সন্দেহ নেই! তবে বন্দিজীবনে অনভ্যস্ত, বিশেষত শহুরে মানুষ হয়ে পড়ছে মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত, ক্লান্ত ও বিরক্ত। আগেই যারা মানসিক সমস্যা কিংবা অস্থিরতায় ভুগছিলেন, তাদের জন্য তো অ্যানসাইটি অ্যাটাক প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। বিদেশি এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, করোনার দিনগুলোতে পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতার পরিমাণ আগের চেয়ে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঝুঁকিতে পড়ছে আমাদের সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্য। সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়ার সবচাইতে বড় কারণগুলোর মধ্যে বিরক্তি ও বিষাদগ্রস্ততা ছাড়াও রয়েছে নেতিবাচক চিন্তাভাবনা, অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি, হতাশা ইত্যাদি। জাতিসংঘের দেওয়া তথ্যমতে নারীর ওপর বেড়েছে নির্যাতনের হার। এসব পারিবারিক সংঘাত ও বাবা-মায়ের মধ্যে কলুষতা বাজে প্রভাব ফেলছে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরেও। তবে সম্পর্কের অবনতি ও পারিবারিক সহিংসতা কখনোই কাম্য নয়। এজন্য কিছু বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে পারেন :
যে কোনো বিষয় কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখছেন তা খুবই জরুরি। ইতিবাচকভাবে সেখার চেষ্টা করুন সব সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একজন তরুণ যদি ঘরে থাকার ব্যাপারটি ‘ঘরে থেকে থেকে বাবা-মা সবকিছুতে বাধা দিয়ে সমস্যা তৈরি করছে’ এরকম না ভেবে ‘বাবা-মায়ের সঙ্গে এখন যেমন সময় কাটানো হচ্ছে, অনেক দিন এমন হয়নি’ ভাবেন, তবে ব্যাপারটি অনেক সহজ হয়ে যায়। আবার বাবা-মাও যদি সন্তানের আধুনিক চিন্তাভাবনা ইতিবাচকতার সঙ্গে গ্রহণের চেষ্টা করেন, সমস্যার সৃষ্টি হয়ই না।
সবারই একটি ব্যক্তিগত জগত্ আছে। প্রচুর অবসর পাচ্ছেন এবং সম্পর্কে মানুষটি আপনার সন্তান, ভাই-বোন, স্বামী, স্ত্রী বা বন্ধু বলেই তার সব ব্যাপারে নাক গলাবেন না। অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয় এই ব্যাপারগুলো থেকেই।
কাজ করতে না পারা কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতির হতাশা ও রাগ প্রিয়জনদের ওপর ঝাড়বেন না। বরং সমস্যাটি ভাগাভাগি করে নিয়ে একত্রে মিলে সমধানের চেষ্টা করতে ক্ষতি কী! একসঙ্গে বসে খানিকটা সময় অতীতের সুন্দর স্মৃতিচারণ করুন। অ্যালবামের ছবিগুলো ঘেঁটে ঘেঁটে দেখুন। এতে করে যদি কোনো সম্পর্কে তিক্ততার সৃষ্টি হয়েও থাকে, তবে তা কমে আসবে। কিন্তু সব সময় মনে রাখবেন, পরিবর্তনই জীবনের ধর্ম। কাজেই সম্পর্কে খানিকটা পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। এটা ভেবে মানসিক অশান্তিতে ভুগবেন না। তবে পরিবর্তনের ব্যাপারটা মেনে নিয়ে নির্যাতন ও সহিংসতা সয়ে যাওয়াও ঠিক নয়। একটি বিষয় সবাই আপনার মতো করে দেখবে, বুঝবে এমন হওয়াটা জরুরি নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তার মানে এই নয় যে ‘আপনাকে কেউ বুঝতে চায় না’—এসব ভেবে সম্পর্কে তিক্ততা আনবেন না। আপনি আপনার দিকটি বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করুন এবং অপর পক্ষের দিকটিও যুক্তি দিয়ে ভাবুন। অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে একে অপরকে সময় দিন। ঘরের কাজগুলো ভাগাভাগি করে নিয়ে করতে পারেন কিংবা অন্তত টুকিটাকি কিছু সাহায্য করতে পারেন। একসঙ্গে বসে গল্প করুন বা প্রিয় কোনো সিনেমাও দেখতে পারেন চাইলে। দুজনেই বইপোকা হলে তো কথাই নেই! গল্প হতে পারে বই নিয়েই। বাবা-মায়েদের ক্ষেত্রে উচিত সন্তানদের সময় দেওয়া। বাবা-মায়েরা চাইলে নিজের টেবিল নিজে গোছানোর মতো টুকিটাকি কাজ দিয়ে শিশুটিকে আত্মনির্ভরতার শিক্ষা দিতে ক্ষতি তো কিছু নেই। সারা দিন ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে পড়ে না থাকাই ভালো। চারদিকের নেতিবাচক সব খবর দেখে মানসিক বিপর্যস্ততা চলে আসে। আবার কেউ তার কোনো প্রাপ্তি শেয়ার করলে, তার সম্পর্কে ‘দেখানোর প্রবণতা আছে’ এ ধরনের নেতিবাচক ধারণার জন্ম হয়। অনেক সময় এ কারণে বন্ধুত্বেও খারাপ প্রভাব পড়ে। কাউকে সমালোচনার মনোভাব নিয়ে না দেখার চেষ্টা করুন। যদিও গঠনমূলক সমালোচনা ভালো, তবু সমালোচনা না করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা দরকার।
এভাবে করোনার দিনগুলোয় পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষয় রোধ করা সম্ভব।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়