শব্দদূষণ প্রতিরোধে সচেতনতা

শব্দদূষণ বলতে মানুষ বা জীবজন্তুর শ্রুতিসীমা অতিক্রমকারী যে কোনো শব্দ সৃষ্টির কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে বুঝিয়ে থাকে। শব্দসন্ত্রাসের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না নবজাতক শিশুটিও। নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে বেড়েই চলেছে শব্দদূষণের তীব্রতা। শব্দদূষণ প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হলেও এর সঠিক বাস্তবায়ন কোথাও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এমনই এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আন্তর্জাতিকভাবে শব্দ সচেতনতা দিবস পালিত হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টার ফর হিয়ারিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন’ প্রথম দিবসটি পালন করে? প্রতি বছর এপ্রিল মাসের শেষ বুধবার দিবসটি পালন করা হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ২০০৩ সাল থেকে বেসরকারিভাবে দিবসটি পালন করে আসছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষের শ্রুতি শব্দের স্বাভাবিক মাত্রা হচ্ছে ‘৪০-৫০’ ডেসিবল। বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপে জানা যায়, দেশের রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে শব্দের মানমাত্রা ‘১৩০’ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে? এমন পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আরেকটি জরিপ দেখলে তা খুব সহজেই সবার অনুমেয়? জরিপে বলা আছে, ৬০ ডেসিবল শব্দ একজন মানুষকে অস্থায়ীভাবে বধির করতে পারে, তবে ১০০ ডেসিবল হলে তা সম্পূর্ণভাবে বধিরতার সৃষ্টি করতে পারে। সারা বিশ্বের ১৫ শতাংশ মানুষ শ্রুতিক্ষীণতার কোনো না কোনো সমস্যায় ভুগছে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যেমন—যুক্তরাজ্য, জার্মানি, বেলজিয়াম ও ইউরোপের অন্যান্য দেশে শব্দদূষণ নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে শব্দদূষণের মাত্রা অসহনীয়। শব্দদূষণের বিশাল একটা অংশ জুড়ে রয়েছে যানবাহনের হর্ন। শহরাঞ্চলের অধিকাংশ যায়গায় সব ধরনের গাড়ি ট্রাফিক জ্যাম অথবা সিগন্যালে পড়ে থাকে। সিগন্যালে অধিকাংশ ড্রাইভার অযথাই হর্ন বাজাতে থাকে। এমন অযাচিতভাবে হর্ন বাজানোকে শব্দদূষণের প্রধান কারণ হিসেবে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া চলতি অবস্থায় উচ্চশব্দের হর্ন ব্যবহার করে থাকে দূরপাল্লার যানবাহনের চালকেরা। এই অযাচিত উচ্চশব্দের হর্ন চালককে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে দূর্ঘটনার শিকার হয় বেপরোয়া যানগুলো। আর নিত্যদিনই আমরা এমন অনেক সড়ক দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করে থাকি। আর এভাবেই বেড়ে যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির সংখ্যা, ঝড়ে যাচ্ছে অগণিত প্রাণ।

যানবাহনের অতিরিক্ত হর্নের পর ধারাবাহিকভাবে শব্দদূষণের অন্তরায় হিসেবে রয়েছে বিভিন্ন নির্মাণকাজের শব্দ, ইট-পাথর ও বিল্ডিং ভাঙার শব্দ, প্রচারণার মাইকিং, কলকারখানার উচ্চশব্দ, রেলগাড়ি চলাচল, ওয়ার্কশপের দোকানে হাতুড়ি পেটার শব্দ, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে সাউন্ডবক্স বাজানো, জেনারেটরের শব্দ, অডিও দোকানগুলোতে সারাক্ষণ গান বাজানো ইত্যাদি। শব্দদূষণের এমন অসংখ্য কারণ প্রতিরোধে বাংলাদেশে ২০০৬ সালে আইন প্রণয়ন করা হলেও তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, যার কারণে শব্দদূষণকারীরা পরিবেশ নষ্ট করে যাচ্ছে। এসব অনিয়ম রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি? শব্দদূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তাদের শব্দদূষণে নিরুত্সাহিত করতে হবে। শব্দদূষণের ভয়াবহতা প্রচারণার মাধ্যমে এর ক্ষতিকারক দিকগুলো সবাইকে জানার ব্যবস্থা করতে হবে।

লক্ষ করলে দেখা যায়, বর্তমান তরুণ প্রজন্মে স্মার্ট ফোনধারীদের মধ্যে অধিকাংশ ব্যবহারকারী রাতে হেডফোনে উচ্চ শব্দের গান লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক এই শব্দদূষণের জন্য দায়ী ভুক্তভোগী নিজেই। এভাবে ইয়ারফোন দিয়ে উচ্চ শব্দে গান শোনার কারণে অন্তঃকর্ণের কোষগুলোর ওপর প্রভাব পড়ে এবং মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক আচরণের সৃষ্টি করে। পুরোপুরি বধির হয়ে যাওয়ার অত্যন্ত ভয়াবহ কারণ এটি। তা ছাড়া শরীরের অস্থিসন্ধিগুলোর ক্ষতি সাধনের মাধ্যমে আর্থ্রাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। শব্দসন্ত্রাসের কারণে মানুষের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা হতে পারে। শারীরিক সমস্যার মধ্যে শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়। এর ফলে বিরক্তি, একাকিত্ব, রাগ, নেতিবাচকতা, কাজে অনীহা, বিষণ্নতা সৃষ্টি ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। এভাবে শব্দদূষণ একজন মানুষকে তার ব্যক্তিগত ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি সৃজনশীলতা বা নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা হ্রাস করে কর্মবিমুখ করে তোলে।

ভয়াবহ শব্দদূষণ থেকে রক্ষা পেতে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং গণমাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে। মোটরযান মালিক ও ড্রাইভারদের উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী হর্ন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করে নীরব এলাকায় যেমন—স্কুল, কলেজ, হাসপাতালগুলোতে হর্ন বাজাতে নিষেধ করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, পল্লি ও নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর ন্যস্ত আইনসিদ্ধ দায়িত্ব ও কর্তব্য সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন এবং কঠোর বাস্তবায়নের মাত্রা ত্বরান্বিত করতে হবে। অযাচিতভাবে লাউড স্পিকার বাজানো থেকে যুবসমাজকে বিরত রাখার আহ্বান করতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা