লকডাউন আরো এক সপ্তাহ বৃদ্ধি করিয়াছে সরকার। বিগত দুই সপ্তাহের মতো আগামী সাত দিনও বন্ধ থাকিবে অফিস-আদালত ও গণপরিবহন। করোনা ভাইরাসের নূতন নূতন যেই সকল ভ্যারিয়েন্টের কথা পত্রপত্রিকা হইতে জানা যাইতেছে, তাহা অত্যন্ত ভয়ের। ইহার হিমশীতল কাঁপুনি আমাদের অস্থিমজ্জায় ঢুকিয়া যাইবার মতো। ইহা এমনই এক রহস্যময় ভাইরাস, যাহার মতিগতি বুঝিয়া উঠিবার মতো সামর্থ্য এখনো বিজ্ঞানীদের হয় নাই। কিছুটা অনুমান করা যায় মাত্র। সেই সূত্র ধরিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে যে, করোনার সুনামি আজ হউক কাল হউক বিদায় লইবে একসময়। কিন্তু ইতিমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির যেই ক্ষতি করিয়া গেল, তাহার গভীর রেশ থাকিবে আগামী কয়েক দশক অবধি।
আমরা আপতত অত দূরে না যাই। এই মুহূর্তে কী করিয়া টিকিয়া থাকা যাইবে, সেই দিকে বরং নজর দেওয়া যাউক। এমনিতেই আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা করোনার পূর্ব হইতেই কিছুটা খারাপ ছিল। ২০১৯ সাল হইতেই আমদানি-রপ্তানি এবং ব্যাংকিং খাতের অবস্থা খারাপ হইতে ছিল, দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিও কমিতেছিল। আর করোনা আসিয়া গত এক বত্সরে কোটি কোটি মানুষের রুটি-রুজিতে টান দিয়াছে। রপ্তানি আদেশ কমিয়া যাওয়া, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান তৈরি না হইবার মতো সমস্যা প্রকট হইয়াছে। পাশাপাশি হিমশিম খাইতে হইতেছে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নেও। একই সঙ্গে ক্রমশই বাড়িতেছে সরকারের ঋণের পরিমাণও। এই যখন অবস্থা, তখন আমরা কি বুঝিতে পারিতেছি কোন গহিন অন্ধকার আমাদের গ্রাস করিতে আসিতেছে? এই মুহূর্তে দম্ভ করিয়া বলিবার কোনো অবকাশ নাই যে, করোনা আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি করিতে পারে নাই, পারিবেও না। বরং দর্পণে আপাদমস্তক নিজেদের দেখিতে হইবে। যদি সার্বিকভাবে দেখা সম্ভব হয়, তাহা হইলে হয়তো কিয়ত্খানিক অনুধাবন করা যাইবে—এই মুহূর্তের সংকট উত্তরণের জন্য আমাদের কী করা উচিত।
তিন সপ্তাহ ধরিয়া সরকারি অফিস-আদালত বন্ধ। সামনে ঈদ। এই অবস্থায় শিল্প কলকারখানা কিংবা বেসরকারি ছোটবড় সকল ধরনের প্রতিষ্ঠানে যাহাদের বেতন-বোনাসের ব্যবস্থা করিতে হইবে, তাহারা কী করিয়া সেই অর্থ সংস্থান করিবেন? লকডাউনে দীর্ঘ ছুটিতে অফিস-আদালত বন্ধ থাকিবার কারণে পাওনা অর্থও আটকাইয়া রহিয়াছে, যাহাদের সহিত ব্যবসা করা হয়, তাহারাও লকডাউনে শাটারডাউন করিয়া বসিয়া আছে সুতরাং এই সংকটে কেহ সুবিধা পাইবে, কেহ আরো তিমিরে ডুবিয়া যাইবে—তাহা কি ন্যায্য কাজ হইবে? সকল প্রতিষ্ঠানই তো বিপদাপন্ন। এই অবস্থায় বৈষম্যের কি কোনো অবকাশ থাকিতে পারে? এই সকল বিপদাপন্ন বেসরকারি পর্যায়ের অফিস-প্রতিষ্ঠান কতদিন চলিতে পারিবে? তাহাদের বড় একটি অংশ কি কর্মী সংকোচন কিংবা অফিস বন্ধ করিয়া দিতে বাধ্য হইবে না? কোনো মানুষ যখন অসুস্থ হইয়া আইসিইউতে থাকে তখন তাহার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এবং অন্যান্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখিতে হয়। নচেত্ তাহাকে বাঁচনো মুশকিল হইয়া পড়ে। তদ্রূপ কোনো প্রতিষ্ঠান আইসিইউতে চলিয়া গেলে তাহার জন্য নগদের সংস্থান জরুরি। এই নগদ অর্থ তখন জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেনের মতো। ইহা ব্যতীত প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানো মুশকিল।
করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময় ক্ষতি যাহা হইবার হইয়াছেই। ইহার পর দ্বিতীয় ঢেউয়ের আকস্মিক আঘাতে বাকি বিশ্বের মতো বাংলাদেশও বিপর্যস্ত। এই অবস্থায় কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন—মুদ্রাস্ফীতি হউক, কিন্তু নগদের জোগান থাকা চাই-ই চাই। বোকারা ঠেকিয়া শেখে, আর জ্ঞানীগুণীরা বড় বিপদ আসিবার পূর্বেই করণীয় বিষয়াদি অনুধাবন করিতে পারেন। সুতরাং আগামী বাজেটে ইহার ব্যবস্থা রাখা বাঞ্ছনীয়। যাহাদের বেতন-ভাতা জোগাইবার যাতনা নাই, তাহারা চিরসুখীজনের মতন। চিরসুখীজনকে লইয়া পারস্যকবি শেখ সাদি যেমনটি বলিয়াছেন (কৃষ্ণচন্দ্রের বাংলা তরজমায়)—‘চিরসুখীজন ভ্রমে কি কখন/ ব্যথিতবেদন বুঝিতে কি পারে।/ কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে/ কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।’