গ্রাম্য সালিশে এ কেমন বর্বরতা!

মাদারীপুরে পরকীয়ার অভিযোগ তুলে প্রহসনমূলক সালিশ বসিয়ে কথিত ভাইবোনকে ১০০ জুতাপেটা করেছে প্রভাবশালী একটি মহল। পরে তাদের জুতার মালা পরিয়ে এলাকা ঘুরিয়ে সমাজচ্যুত করে ঘরে তালা ঝুলিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে গত ১৯ এপ্রিল রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের সুতারকান্দি গ্রামে। মাতবরদের ভয়ে বিষয়টি প্রথমে গোপন রাখা হলেও গতকাল মঙ্গলবার লোকমুখে বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় মামলা হলে রাজৈর থানার পুলিশ তিন সালিশকারীকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায়।

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার পেয়ারপুর গ্রামের এক যুবকের (৪০) সঙ্গে রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের সুতারকান্দি গ্রামের এক নারীর (৫০) ‘ধর্মীয়ভাবে’ ভাইবোনের সম্পর্ক রয়েছে। ঘটনার দিন সকাল ৯টার দিকে ঐ যুবক তার কথিত বোনের বাড়ি বেড়াতে আসেন। কিছুক্ষণ পরে একই বাড়ির কালু ফকির, ইমরান ফকির, শাকিব আকন, রানা ফকির, শামীম ফকিরসহ ৮-১০ জন তাদের ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে বাইরে এনে বেঁধে ফেলে। একপর্যায়ে বাড়ির উঠানে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রহসনের সালিশ বসায়। কালু ফকির গং কারো বক্তব্য না শুনে তাদের ইচ্ছেমতো রায় ঘোষণা করে। রায় অনুযায়ী তাদের ১০০ জুতাপেটা শেষে জুতার মালা পরিয়ে সারা এলাকা ঘুরিয়ে ঘরে তালা ঝুলিয়ে সমাজচ্যুত করা হয়। প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি।

এ ঘটনায় ২৫ এপ্রিল রাতে সালিশ বৈঠকের প্রধান হোতা কালু ফকির, ইমরান ফকির, শামীম ফকিরসহ সাত জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ৮-১০ জনের নামে রাজৈর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগীর স্বামী। পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কালু ফকির, আজিজুল ফকির ও শাকিব আকনকে গ্রেফতার করে মাদারীপুর জেলহাজতে পাঠায়।

নির্যাতনের শিকার নারী বলেন, ‘এই অপমানের পর আর কি বাইচ্যা থাকতে ইচ্ছা করে! গেছিলাম মরতে, তয় তারা (মেম্বার) কইছে আমার অপমানের বিচার কইরা দিব। হেই কারণে মরি নাই। যদি বিচার না পাই, তাইলে আমি আর দুনিয়ায় থাকুম না।’

এলাকার মেম্বার তারা মিয়া ব্যাপারী বলেন, ‘ধর্মের ভাইবোনকে কথিত বিচারের নামে একটি প্রহসনের সালিশ বসায়। সালিশে এলাকার মেম্বার হিসেবে আমার কোনো কথাই তারা শোনেনি। এমনকি নির্যাতিত ঐ নারীর কোনো কথা না শুনে কালু ফকির গং নিজেদের ইচ্ছেমতো রায় ঘোষণা করে।’

বাজিতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, ‘জঘন্যতম কাজটি যারা করেছে, যারা আইনকে নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে, তাদের এবং এর পেছনে ইন্ধনদাতাদেরও বিচার হওয়া উচিত।’

নির্যাতিতার স্বামী বলেন, ‘আমি আইজ দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে আমার স্ত্রীকে নিয়ে ঘর-সংসার করে আসছি। তার চরিত্র খারাপ হলে আমিই আগে জানতাম। যদি আমার স্ত্রী কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে বিচার করতাম। আমার ছেলেমেয়ে আছে, তাদের বিয়ে দিয়েছি, নাতি-নাতনি রয়েছে। আমরা কীভাবে মানুষরে মুখ দেখাব? আমি এর বিচার চাই।’

প্রহসনের সালিশের প্রধান হোতা কালু ফকির বলেন, ‘ঐ মহিলাকে একটু শাসনের জন্য সালিশ করা হয়। সালিশে অনেক মাতবর ছিল। তারা সবাই মিলে এ রায় দেয়।’

রাজৈর থানার ওসি শেখ সাদী বলেন, বর্বরোচিত এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। বাকি আসামিদের ধরার ব্যাপারে জোর তত্পরতা অব্যাহত রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। আমার কাছে ঐ নারী এসেছিলেন এবং একটি অভিযোগ দিয়েছেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে থানাকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছি।’