বাংলাদেশে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি এবং দেশের বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা ও বিরোধ-নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ভূমি নিয়ে জটিলতা ও মামলা অত্যধিক। দেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৩৮ লাখ মামলা বিচারাধীন এবং অধস্তন আদালতে প্রায় ৩২ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। প্রায় ৩২ লাখ মামলার বিপরীতে মাত্র ১ হাজার ৮০০ বিচারক নিয়োজিত রয়েছেন। বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে জনসংখ্যা অনুপাতে সবচেয়ে কম বিচারক আছে এবং বলা হয়ে থাকে, প্রতি ১০ লাখ জনগণের জন্য এক জন বিচারক নিয়োজিত আছেন। বাংলাদেশে দেওয়ানি মামলা ও আদালতের কার্যক্রমে আইনি জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা অনেক বেশি। দেশে প্রায় ১৩ লাখ দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া ফৌজদারি মামলার প্রায় ৭০ শতাংশ মামলা ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ থেকে উদ্ভূত। পারিবারিক বিরোধ নিয়ে যৌতুক ও নারী নির্যাতনসংক্রান্ত বিষয়ে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গরিব ও অসহায় মানুষের আইনি সহযোগিতার উদ্দেশ্যে ২০০০ সালে জাতীয় আইনগত সহায়তা আইন প্রণয়ন করে এবং দেশব্যাপী লিগ্যাল এইডের ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ৬৪টি জেলার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে একজন বিচারকের অধীনে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারগণ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আপস-মীমাংসাসহ যে কোনো বিষয়ে আইনগত সহায়তার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী মার্চ ২০২০ পর্যন্ত ৫ লাখ ৭ হাজার ৮০ ব্যক্তি আইনগত সুবিধা পায় ও ৩৫ কোটি ৩৬ লাখ ১৩ হাজার ৪২২ টাকা ক্ষতিপূরণ ও আপস-মীমাংসায় আদায় করা হয়। গত ২০১৮-১৯ বছরে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার, ১০ হাজার ৩৫৭ ব্যক্তিকে সরাসরি আইনিসুবিধা প্রদান করা হয়। এছাড়া অক্টোবর ২০২০ পর্যন্ত সময় সারা দেশের লিগ্যাল এইড অফিসসমূহ ৩৪ হাজার ৩৭৩টি মামলা ও দুইটি শ্রম আদালতে ২ হাজার ৪১টি মামলার আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেন। শুধু ২০২০ সালে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে ৯ হাজার ১৬৬টি মামলার বিরোধ-মীমাংসা করেন।
লিগ্যাল এইড অফিসের সবচেয়ে সুবিধাভোগী হচ্ছে গরিব অসহায় নারীরা। মোট কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ আইনি সমাধান নারীদের অভিযোগের ভিত্তিতে করা হয়। পারিবারিক কলহ, সহিংসতা, যৌতুক ও দেনমোহরসংক্রান্ত বিরোধ অত্যন্ত সহজে ও ইতিবাচকভাবে সমাধান করা হয়। এছাড়া মামলা দায়ের ও আসামিদের জামিনের বিষয়ে আইনজীবী নিয়োগ যাবতীয় খরচ লিগ্যাল এইড অফিস বহন করে। কার্যকর উপায়ে মামলা নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে আইন সংশোধন করে ২১এ ধারায় সিনিয়র সহকারী জজ/সহকারী জজ পর্যায়ের বিচারককে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার হিসাবে আইনগত মতামত ও আপস-মীমাংসা করার ক্ষমতা প্রদান করেন।
এছাড়া বর্তমান সরকার ২০১৫ সালে বিকল্প বিরোধ-নিষ্পত্তি (এডিআর ও আইনি মতামত) বিধিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারকে বিরোধীয় পক্ষদের মধ্যে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে আদালতের বাহিরে আপস-মীমাংসা করার ক্ষমতা প্রদান করেন। সরকার আপস-মীমাংসার বিষয়টিকে কার্যকর করার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে দেওয়ানি কার্যবিধি আইন, ১৯০৮ সংশোধনক্রমে উক্ত আইনের ৮৯এ এর ১ উপধারায় আদালতে বিদ্যমান দেওয়ানি মামলা আপস-মীমাংসা (এডিআর) করার লক্ষ্যে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারকে ক্ষমতা প্রদান করা হয়। সরকার ‘লিগ্যাল এইড’-এর কার্যক্রমকে গতিশীল করার লক্ষ্যে এটাকে ২০১৯ সালে ‘বিচারিক কাজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আপস-মীমাংসা ও আইনগত মতামত বিধিমালা ২০১৫ এবং দেওয়ানি কার্যবিধি আইন মোতাবেক জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মামলা দায়েরের পূর্বে এবং মামলা দায়েরের পরে বিরোধীয় পক্ষগণের মধ্যে আপস করার বিষয়ে আইনগতভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখার ব্যাপক সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে মামলার পূর্ব আপস প্রক্রিয়া অধিক ফলপ্রসূ মর্মে প্রতীয়মান হয়। লিগ্যাল এইড অফিসার বিরোধের বিষয়ে আপস-মীমাংসার লক্ষ্যে বিবাদীপক্ষকে নোটিশ করতে পারবেন ও মীমাংসা সভার আয়োজন করবেন। উক্ত মীমাংসা সভায় উভয়পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার উভয়পক্ষকে মীমাংসাপত্র (এডিআর) প্রদান করবেন এবং তা আইনি দলিল ও প্রমাণ হিসেবে আইনগত ভিত্তি লাভ করবে এবং সর্ব আদালতে গ্রহণযোগ্য মর্মে বিবেচনা করবে।
দেওয়ানি মামলা চলমান অবস্থায় দেশের সব আদালত থেকে বিরোধীয় পক্ষগণের মধ্যে আপস-মীমাংসার উদ্দেশ্যে বিজ্ঞ বিচারকবৃন্দ দেওয়ানি মামলাসমূহ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের কাছে প্রেরণ করতে পারবেন। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার উক্ত মামলা গ্রহণ করে উভয়পক্ষকে নোটিশ করে মীমাংসা সভার আয়োজন করে আপস-মীমাংসা সম্পূর্ণ করবেন এবং উক্ত মীমাংসাপত্রসহ (এডিআর) মামলাটি সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রেরণ করবেন। বিজ্ঞ আদালত মামলাটি গ্রহণপূর্বক প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করে উক্ত গৃহীত আপস-মীমাংসার ভিত্তিতে রায় ও ডিক্রি প্রচার করবেন।
বর্তমানে সারা দেশে পূর্ণ সময়ের জন্য জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সহকারী জজ/সহকারী জজ) হিসাবে পদায়ন করা হয়েছে। লিগ্যাল এইড অফিসারগণ অত্যন্ত আন্তরিকতার সহিত, আইনগত বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক মামলার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আপস-নিষ্পত্তির লক্ষ্যে এডিআর কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। প্রত্যেক অফিস দৈনিক প্রায় এক-পাঁচটি বা তারও বেশি মামলার ও দরখাস্তের আপস-নিষ্পত্তি কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে। প্রায় শতকরা ৭০-৮০ ভাগ ক্ষেত্রে বিরোধ-নিষ্পত্তির উদ্যোগ আলোর মুখ দেখে। উল্লেখ্য যে, বিদ্যমান আইনে আদালতের বাহিরে শুধু জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমেই মামলার বা বিরোধের আইনগত প্রক্রিয়ায় আপস-মীমাংসার সুযোগ রয়েছে। বর্তমান সরকার, মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে এডিআর কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন দাতা সংস্থা, এনজিও ও সরকারের বিভিন্ন অফিসের সঙ্গে সমন্বয় করে এডিআর কার্যক্রমকে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
সরকার এডিআরের কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে লিগ্যাল এইড অফিসকে এডিআর কেন্দ্র হিসাবে ঘোষণা করেছে। এছাড়া ২০১৩ সাল থেকে ২৮ এপ্রিলকে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ হিসেবে উদ্যাপন করা হয়। সম্প্রতি সাতটি বিভাগীয় জেলায় সাতটি শ্রম আদালতে আইনগত সহায়তা সেল করা হয়েছে। আমরা আশা করতে পারি যে, বর্তমান সরকার গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং কার্যকর বিচারব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে মামলার জট নিরসনকল্পে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসকে একটি কার্যকর, গতিশীল ও আপস-মীমাংসার কেন্দ্রস্থল হিসেবে এর কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাবে।
n লেখক : সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ফেনী