ভুয়া বাদীর মামলায় আসামির এক সপ্তাহ হাজতবাস

মামলার বাদী ভুয়া। সাক্ষী ও বাদীর ঠিকানাও ভুয়া। এমনকি মামলা দায়ের করতে বাদীর নোটারিও জাল করা হয়েছে। তবে আসামির নাম ও ঠিকানা সঠিক। মামলা দায়েরের পর আদালত মামলাটি তদন্ত করতে না দিয়ে আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করে। এরপর পুলিশ ঐ আসামিকে গ্রেফতার করে। এ অবস্থায় কয়েকবার জামিনের শুনানির দিন পরিবর্তন হওয়ার কারণে আসামিকে এক সপ্তাহ কারাগারে হাজতবাস করতে হয়। পরে আসামি জামিন পাওয়ার পর আদালত বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে পায় যে, মামলার সবটুকুই ভুয়া এবং আসামিকে হয়রানি করার জন্য একটি চক্র ঐ মামলা দায়ের করেছিল।

এ ধরনের একটি প্রতারক চক্র রয়েছে যারা আদালতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা সাজিয়ে হয়রানি করছে। এসব কথিত মামলার বাদী ভাড়াটে নারী-পুরুষ। আসামি চেনেন না বাদীকে। বাদী চেনেন না আসামিকে। এসব গায়েবি মামলাবাজ সিন্ডিকেটের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়েছেন শত শত ভুক্তভোগী।

জানা গেছে, গত ৭ অক্টোবর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে দায়ের করা সিআর মামলা নং-৪৪০/২০২০ তে বাদীর নাম-ঠিকানা বলা হয়েছে জাকির হোসেন, বাসা নং-৫২/ক/১, ফ্ল্যাট-এ-২, রোড ৮/এ, ধানমন্ডি, ঢাকা। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে আসামি সৈয়দ রফিকুল ইসলাম দিলুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। পুলিশ ১৩ অক্টোবর রাতে মনিপুরীপাড়ার ১৪৭/সি নম্বর বাড়ি থেকে আসামিকে গ্রেফতার করে পরদিন আদালতে পাঠায়। আদালত তার জামিনের শুনানির সময় বাদীকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। বেশ কয়েক দিন বাদী হাজির হতে পারেননি বলে ১৯ অক্টোবর আদালত আসামিকে জামিন দেয়। জামিন পাওয়ার পর ঐ মামলায় আসামি পুনরায় আদালতে হাজির হয়ে মামলার বাদী ও সাক্ষীদের দেখতে চায়। আদালত বিষয়টি তদন্ত করে মামলার বাদী জাকির হোসেনকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু বাদী জাকির হোসেনের পক্ষে ওকালনামায় স্বাক্ষর করা আইনজীবী খালিদ হোসেন আদালতকে জানান যে, মামলার বাদী জাকির হোসেনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন আদালত মামলার বাদীর ঠিকানা যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দেয় ধানমন্ডি থানা পুলিশকে।

ধানমন্ডি থানার এএসআই মোখলেসুর রহমান জানান, তিনি তদন্ত করে আদালতের কাছে রিপোর্ট দিয়েছেন। রিপোর্টে উল্লেখ করেন, ধানমন্ডির ৮/এ নম্বর রোডের ৫২/ক/১ নম্বরের কোনো বাড়ি নেই। রোড নং-৮/এ তে ৫২/১ নম্বর বাড়ি আছে। ঐ বাড়িতেও জাকির হোসেন নামে কেউই কোনো দিন বসবাস করেননি।

এ ব্যাপারে ঐ মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী খালিদ হোসেন গতকাল বলেন, আসলে কেউ যদি তার জাতীয় পরিচয়পত্র ও অন্যান্য তথ্য নিয়ে একজন আইনজীবীর কাছে আসেন, আমরা মামলা দায়েরে সহায়তা করি। এ ব্যাপারে মামলার বাদী জাল জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করেন কি না—তা নিশ্চিত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।

দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা মামলা করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর ফৌজদারি কার্যবিধি ২৫০ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন আদালত। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা আমলযোগ্য নয় এরকম কোনো মামলায় মিথ্যা প্রতিবেদন দিলে তার বিরুদ্ধেও এ ধারা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন আদালত। মিথ্যা মামলা ছাড়াও দণ্ডবিধির ১৯৩, ১৯৪ এবং ১৯৫ ধারায় বলা আছে মিথ্যা সাক্ষ্যের মাধ্যমে মিথ্যা মামলায় সহায়তা অপরাধ। এই অপরাধে ৭ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে।

ঢাকার আদালতের একজন আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, মিথ্যা মামলা হলে আসামি বাদীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন। কিন্তু যে মামলায় বাদীর কোনো অস্তিত্ব নাই, কার বিরুদ্ধে মামলা করবেন? দণ্ডবিধিতে এ সংক্রান্ত আসামির হয়রানির ক্ষতিপূরণের কোনো সুযোগ নেই।

এ ব্যাপারে ঢাকার আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আবু বলেন, এই মিথ্যা মামলা থেকে আগে ভিকটিমকে অব্যাহতি দিতে হবে। এরপর আদলত তদন্ত করে দেখবে এই মিথ্যা মামলা দায়েরকারী চক্রটি কারা। এই ধরনের মিথ্যা মামলা দায়েরে ভিকটিমকে আইনি সহায়তা দিতে হবে। ভিকটিম কার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবে—সেটাও ঠিক করা উচিত।