হীরা ‘মানিক’ জ্বলে

দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল। কলকাতায় কোনো এক বিখ্যাত বাঙালি নাকি মারা গেছেন! পরের দিন শুক্রবার বিটিভিতে দেখানো হলো সেই বিখ্যাত পরিচালকের প্রথম সিনেমা ‘পথের পাঁচালি’। আমি তখন নবম শ্রেণিতে পড়ি। বিটিভিতে তখন প্রতি শুক্রবার বাংলাদেশের সিনেমা আর হঠাত্ বছরে কোনো এক-দু’দিন ভিসিপি ভাড়া করে ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি সিনেমা দেখা হতো। সিনেমা দেখাটা ছিল উত্সবের মতো। প্রতিবেশী যাদের বাড়িতে টিভি ছিল না, তারাও আমাদের যৌথ পরিবারের বড় ঘরের মেঝেতে বসে সিনেমা দেখত। সত্যজিতের মৃত্যুর পরের দিন ২৪ এপ্রিল শুক্রবার বৈশাখের তপ্ত দুপুরবেলায় তাঁর ‘পথের পাঁচালি’ দেখার জন্য পাড়া প্রতিবেশী মিলিয়ে আমাদের ঘর জুড়ে জনা বিশেক মানুষ অপার আগ্রহ নিয়ে টিভির সামনে আসন নিল। ছবি শুরু হলো। সাদা-কালো উত্তেজনাহীন কাহিনি। ঘণ্টাখানেক পর দেখা গেল পথের পাঁচালি চলছে, সেই সঙ্গে চলছে নাক ডাকার শব্দ। বিখ্যাত ছবি বলে কথা, আমারও ঘুম পেলেও জোর করে সবটুকু দেখার চেষ্টা করি। কিন্তু খুব বেশি মনে দাগ কাটে না।

বনফুলের একটি বিখ্যাত গল্প আছে ‘পাঠকের মৃত্যু’। স্টেশনে বসে এক পাঠক অন্য যাত্রীর কাছ থেকে ধার করে একটি উপন্যাস পড়ছিলেন। এমনই অসাধারণ ছিল বইটি যে ঐ পাঠক সেটা এক অর্থে গোগ্রাসে গিলছিলেন। কিন্তু তারপরও বইটি পড়া শেষ হয় না, ট্রেন চলে আসে। ভীষণ আক্ষেপ থেকে যায় বইটি শেষ করতে না পারার জন্য। এর অনেক বছর পর ঐ পাঠক ঐ বইটি আবার ফিরে পান। তুমুল উত্তেজনা নিয়ে পড়তে বসেন তিনি। কিন্তু এ কী! পড়তে পড়তে ভীষণ অবাক হয়ে ঐ পাঠক ভাবলেন, এত বিচ্ছিরি বই কেউ লিখতে পারেন! বনফুলের এ গল্পের মতো এভাবে পাঠকের যেমন মৃত্যু হয়, তেমনি জন্মও হয়। যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসটি আমি প্রথম পড়ি সেভেনে পড়ার সময়। আমার মনে হয়েছিল এত জটিল কাঠখোট্টা ঘুমপাড়ানি উপন্যাস মানুষ কী করে পড়ে শেষ করে? এরপর আমি জগন্নাথ হলে বসে উপন্যাসটি আবার পড়ি, এক মাসের ব্যবধানে আবারও পড়ি। অমিত-লাবণ্যের জাদুতে সেই যে আবিষ্ট হলাম, তা এখনো আমার যায়নি। বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালি’ এসএসসির দ্রুতপঠনে পাঠ্য ছিল। এটাও আমি এসএসসি দেওয়ার তিন বছর আগেই কিছু অংশ পড়ে ফেলেছিলাম। সেসময় আমরা বন্ধুরা হুমায়ূন, সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশ পাল্লা দিয়ে পড়ছি। বলতে দ্বিধা নেই, ১৩ বছর বয়সে পথের পাঁচালি আমার ভালো লাগেনি। এখন বুঝি অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীর জন্য পথের পাঁচালি নয়। প্রত্যেকটি বই পড়ারই নির্দিষ্ট বয়স আছে, তেমনি কিছু কিছু সিনেমা দেখারও নির্দিষ্ট বয়স আছে। এমনকি তার জন্য প্রজ্ঞাও লাগে।

‘পথের পাঁচালি’, ‘অপরাজিত’ আর ‘অপুর সংসার’ এই অপু ট্রিলজি কী করে নির্মাণ করা হলো, এটা নিয়ে দেশ পত্রিকা তাদের শারদীয় সংখ্যায় দুই কিস্তিতে সত্যজিতের জাদুকরি আত্মজীবনী ছেপেছিল। জাদুকরিই বলব, কারণ, এটা যেকোনো পাঠককে সুস্পষ্টভাবে একটি চলমান ছবির মতো সবকিছু দেখিয়ে দেবে। শারদীয় দেশ পত্রিকায় সত্যজিত্ রায়ের ‘মাই ইয়ার্স উইথ অপু’-এর বাংলা অনুবাদ ‘অপুর পাঁচালি’র দুই কিস্তি যখন আমি পড়ি তখন আমার বয়স খুব বেশি হলে ১৭ বছর। আমি এক অভিভূতকর সৃষ্টির জগতে ঢুকে পড়লাম! সত্যজিত্ কীভাবে চলচ্চিত্রের বিস্ময়জগতে পা রাখলেন, আমি যেন টাইমমেশিনে করে সত্যজিতের পাশে পাশে সেই বিস্ময়যাত্রা শুরু করলাম। সত্যজিত্ যা করছেন, সব যেন আমি দেখতে পাচ্ছি ‘অপুর পাঁচালি’র অক্ষরগুলোর ভেতর দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিরা যে-দিন বোমাবর্ষণ করে, সেই দিনই শান্তিনিকেতনের পাঠ অসম্পূর্ণ রেখেই সত্যজিত্ কলকাতায় পা রাখেন। জাপানিদের বোমাবর্ষণে সবাই যখন ভীত সন্ত্রস্ত, সত্যজিতের তখন মনে হলো যে, হ্যাঁ, যেখানে ঘটনা ঘটছে, সেখানে এসেই পৌঁছেছেন তিনি। সেসময় রাস্তাঘাটে গিসগিস করছে মার্কিন সৈন্য। এদিকে বোমার ভয়ে অর্ধেক লোক কলকাতা ছেড়ে চলে গেছে। যারা ছবির ভক্ত, তাদের পক্ষে আবার ঐটাই ছিল মস্ত সুসময়। কারণ, হলিউডের টাটকা সব ছবি তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আর কলকাতায় একইসঙ্গে মুক্তি দেওয়া হচ্ছিল। সে-সব ছবি সত্যজিত্ তখন একটার পর একটা আশ মিটিয়ে দেখে নিয়েছেন। এরপর তিনি একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় শিল্পনির্দেশক হিসেবে কাজ জুটিয়ে নেন। ঐ সংস্থার কাজেই সত্যজিেক লন্ডনে পাঠানো হয়, তিনি তখন লন্ডনে বসে আশ মিটিয়ে প্রায় শ’খানেক চলচ্চিত্র দেখে ফেলেন। ইতালির বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ভিত্তোরিও দে সিকা নির্মিত ‘বাইসাইকেল থিফ’ দেখে সত্যজিতের মধ্যে একটি ঘোর তৈরি হয়। তাঁর মধ্যে সিনেমা বানানোর স্বপ্ন একটু একটু করে অঙ্কুরিত হতে থাকে। এরপর ১৯৪৯ সালে ফরাসি চলচ্চিত্রকার জঁ রেনোয়া যখন কলকাতায় ‘দ্য রিভার’ ছবির শুটিং করেন, তখন সত্যজিত্ অত্যন্ত কাছ থেকে এ ছবির সমস্ত কাজ দেখেন। সেইসঙ্গে মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে ছবি নির্মাণের দুঃসাহসী স্বপ্ন। তিনি টাকা জমাতে থাকেন, বিমা কোম্পানি থেকে ঋণ গ্রহণ করেন, আত্মীয় বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করেন—তারপর ১৯৫২ সালের শরত্কালের এক বিকেলে ৩১ বছর বয়সী তরুণ সত্যজিত্ রায় সাদা কাশফুলে ছাওয়া এক মাঠের মধ্যে শুরু করেন ‘পথের পাঁচালি’র প্রথম শুটিং। দীর্ঘ সাদা কাশফুলের ক্যানভাসে যেন আঁকা হতে থাকে বিস্ময়কর এক চলচ্চিত্রকারের অভাবিত শিল্পযাত্রা।

এসব জানার পর মনে হয়, একজন বিস্ময়কর শিল্পস্রষ্টাকে গড়ে তোলার জন্য সবকিছু কেউ যেন নিখুঁতভাবে সাজিয়ে রেখেছিলেন। তবে সত্যজিতের পথের পাঁচালি নির্মাণের যাত্রাপথ ছিল বিপুল খানাখন্দে ভরা। সত্যজিত্ নিঃস্ব হয়ে পড়েন, দামি দামি বই কিংবা যাবতীয় মূল্যবান জিনিস বিক্রি করেও ছবি নির্মাণ শেষ করতে পারেন না। গভীর হতাশা আর অনিশ্চয়তার কৃষ্ণমেঘ আরো ঘন হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের বিশেষ অনুগ্রহে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থায়নে পথের পাঁচালির নির্মাণ শেষ হয়। অতঃপর ১৯৫৫ সালে ২৬ আগস্ট পথের পাঁচালির মুক্তি ঘটে। ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয় বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উত্সবে, বিপুল জনপ্রিয়তা পায় আমেরিকায়। সেই জনপ্রিয়তার সূত্র ধরে কলকাতায়ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পথের পাঁচালি।

আমি মোহমুগ্ধের মতো সত্যজিতের চলচ্চিত্রকার হয়ে ওঠার কাহিনি পড়তে পড়তে চলমান ছবির মতো সবকিছু দেখতে থাকি ‘অপুর পাঁচালি’র মধ্যে। তারপর দেখতে থাকি সত্যজিতের একের পর এক ছবি। ‘ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স’ বলে একধরনের প্রশিক্ষণ আছে, যার মাধ্যমে শেখা যায় একটি চলচ্চিত্রের ভেতরকার বিস্ময়জগত্খানি। সেটা শেখা না থাকলে চলচ্চিত্রের শব্দ-আবহ-চলমান ছবির মানে ‘সম্পূর্ণভাবে’ ধরা দেয় না দর্শকের কাছে। যেমন আপনি মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’ কিংবা ঋত্বিকের অনেক ছবিই কেবল সাদা চোখে দেখে পুরোপুরি বুঝতে পারবেন না। এরকম অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। সত্যজিতের ছবিগুলো তেমনই, মোটামুটি অনুধাবন করতে হলে চলচ্চিত্র অনুধাবনের ন্যূনতম শিক্ষা চাই। নিজে নিজেও সেই অনুধাবনের বিষয়টি শিখে নেওয়া যায়। সেটা শেখা না থাকলে এসব চলচ্চিত্রকে বাস্তবিক অর্থে দেখা সম্ভব নয়।

সত্যজিত্ রায় এমন দুজন প্রতিভাবান মানুষের উত্তরসূরি, যাঁরা ছিলেন বাংলা শিল্প-সাহিত্যের অগ্রদূত। সত্যজিতের ঠাকুরদা (বাবার বাবা) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর প্রতিভা ছিল রেনেসাঁসের সময়কার মানুষের প্রতিভার মতোই বহুমুখী। আর সত্যজিতের বাবা সুকুমার রায় মাত্র ৩৬ বছরের আয়ুষ্কালেই বাংলা সাহিত্যের জন্য যা দিয়ে গেছেন তার আবেদন কোনোদিনও ফুরাবে না।

বিশ্বসাহিত্যের দরবারে বাংলা সাহিত্যকে স্থাপন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, আর বিশ্ব চলচ্চিত্রে বাংলা চলচ্চিত্রকে অভাবিত উচ্চতায় আসীন করেছেন সত্যজিত্ রায়। রবীন্দ্রনাথের মতো সত্যজিত্ও ছিলেন সব্যসাচী। শুধু চলচ্চিত্র নয়, শিশুতোষ সাহিত্য, গোয়েন্দা কাহিনি, কল্পবিজ্ঞান কিংবা ফ্যান্টাসি ধরনের গল্পকাহিনি রচনাতে সত্যজিতের তুলনা মেলা ভার। এমনকি বইয়ের প্রচ্ছদ, অলংকরণ, বাংলা হরফের রূপ নির্মাণ ও বিন্যাস রচনাতেও সত্যজিতের স্বকীয়তা আমাদের বিস্ময়াপ্লুত করে। আর চলচ্চিত্র সমালোচক ও তাত্ত্বিক হিসেবে তো তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠদের একজন। তাঁর সৃষ্ট ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। তিনিই দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব যাঁকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। প্রথম চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে অক্সফোর্ডের ডিলিট পেয়েছিলেন চার্লি চ্যাপলিন। ১৯৮৭ সালে ফ্রান্সের সরকার তাঁকে সে দেশের বিশেষ সম্মনসূচক পুরস্কার লেজিওঁ দ’নরে ভূষিত করে। ১৯৮৫ সালে পান ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। ১৯৯২ সালে মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে অস্কার অ্যাকাডেমি তাঁকে আজীবন সম্মাননাস্বরূপ অ্যাকাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার প্রদান করে। এমন বিস্ময়কর প্রভিতার জন্মশতবর্ষ আগামী ২ মে।

সত্যজিত্, যাঁর ডাকনাম ‘মানিক’—এই মানিকের আদিনিবাস ছিল এই বাংলাদেশেই, কিশোরগঞ্জ জেলায়। বিভূতিও কি জানতেন এই ‘মানিক’ হীরা হয়ে জ্বলবেন সারাবিশ্বে? সত্যজিেক যত দেখা যায়, যত পড়া যায়, যত জানা যায় ততই আমাদের চোখের সামনে বিস্ময়জগত্ হাট মেলে বসে। এই হাটে বেচাকেনার মতো আনন্দ আর কি কোথাও আছে?