মুফতী মো. আব্দুল্লাহ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
৮। ইফতারী : সূর্য ডুবে গেছে মর্মে নিশ্চিতভাবে জানার পরও ইফতার করতে বিলম্ব করা মাকরূহ। তবে হ্যাঁ, মেঘ-বৃষ্টি ইত্যাদির দরুন যদি সংশয় জাগে, সেক্ষেত্রে ২/৪ মিনিট বিলম্ব করাই উত্তম। তাছাড়া, সাহরী, ইফতার ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিন মিনিটের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ সর্বক্ষেত্রেই থাকা চাই (মুফতী মুহাম্মদ শফী‘ র.: জাওয়াহিরুল ফিকহ্, ১ম খন্ড, পৃ-৩৮১)।
৯। তারাবীহ : (১) মাহে রামাদানে এশা’র সালাতের ফরয ও দু’রাকাত সুন্নাতের পর বিশ (২০) রাকাত তারাবীহ নামায আদায় করা ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদা’। (২) জামা‘আতের সঙ্গে তারাবীহ নামায আদায় করা ‘সুন্নাতে কিফায়া’। (৩) তারাবীর মধ্যে পুরো ত্রিশ পারা কুরআন পাঠ করাও আরেকটি পৃথক সুন্নাত। (৪) কোন হাফেয যদি এক মসজিদে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়িয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে একই রাতে অন্য মসজিদে আবার তারাবীহ পড়ানো জায়েয নেই। (৫) কারও যদি ২/৪ রাকাত তারাবীহ ছুটে যায়, সেক্ষেত্রে ইমাম যখন বিতির এর জামাত পড়ান তখন ওই ব্যক্তিরও ইমামের সঙ্গে বিতির পড়া চাই। নিজের বকেয়া ওই কয় রাকাত পরে পড়ে নিতে পারবেন। (৬) পবিত্র কুরআনকে এত দ্রুত পাঠ করা, যে কারণে কোন শব্দ বা হরফ বাদ পড়ে যায় —তা পাপের মধ্যে গণ্য। সেক্ষেত্রে ইমাম ও মুক্তাদী উভয়েই সওয়াব হতে বঞ্চিত হবেন। (৭) জুমহুর আলেমগণের গবেষণামূলক চূড়ান্ত ফাতওয়া হল, নাবালককে তারাবীর জামাতের ইমাম বানানো জায়েয নয় (শামী ইত্যাদি দ্র.)।
১০। ই‘তিকাফ : (১) ই‘তিকাফরত অবস্থায় এমন সব প্রয়োজন ব্যতীত মসজিদ থেকে বাইরে বের হওয়া জায়েয নয়, যা মসজিদে সম্পাদন করা যায় না। যেমন মল-মুত্র ত্যাগ করার প্রয়োজন বা ওয়াজিব গোসলের প্রয়োজন বা উযূ ইত্যাদির প্রয়োজনে। (২) মাহে রামাদানের শেষ দশকে ই‘তিকাফ করা ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদা কিফায়া’। (৩) ই‘তিকাফ অবস্থায় একেবারে চুপচাপ থাকা জরুরী নয় বরং তেমনটি মাকরূহ। অবশ্য বিভিন্ন নেক আমলের পাশাপাশি অবসর সময়ে ভালো কথা, সওয়াবের আলোচনা করা, নবী-রাসূল ও ওলী-আউলিয়াদের জীবনী বিষয়ে পরস্পর আলোচনা এবং তা‘লীমের মাধ্যমে সময় পার করা উচিত। তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়া-বিবাদ ও অনর্থক বাক্যালাপ থেকে বেঁচে থাকা চাই। (৪) ই‘তিকাফ অবস্থায় বিশেষ কোন ইবাদত করা শর্ত নয়; নামায, তিলাওয়াত বা ধর্মীয় বই-পুস্তক পাঠ, পড়ানো অথবা মনের চাহিদা মোতাবেক যে কোন ইবাদতই করা যেতে পারে। (৫) যে মসজিদে ই‘তিকাফ করা হচ্ছে, তাতে যদি জুমু‘আর সালাত না হয়, তা হলে পার্শ্ববর্তী জামে মসজিদে জুমু‘আর উদ্দেশ্যে এমনভাবে অনুমান করে বের হবে যেন সেখানে গিয়ে সুন্নাত পড়া শেষ করে খোত্বা শোনা যায় । অবশ্য সেই জামে মসজিদে যদি কিছুটা বেশী সময় কেটে যায়, তাতেও ই‘তিকাফের কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু পথিমধ্যে বা মসজিদের বাইরে যদি অনুমেদিত প্রয়োজন ছাড়া সামান্য সময়ও বিলম্ব করে তা হলে ই‘তিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। (৬) স্বভাবজাত প্রয়োজন ও শরীয়তসম্মত কোন প্রয়োজন ব্যতীত যদি সামান্য সময়ের জন্যও মসজিদ থেকে বাইরে চলে যায় অথবা প্রয়োজনে গিয়ে অপ্রয়োজনে বাইরে অবস্থান করে; তা হলে ই‘তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে; হোক তা ভুলবশত বা ইচ্ছাকৃত। তেমনটি করলে ওই ই‘তিকাফ পরবর্তিতে কাযা করতে হবে। (৭) মাহে রামাদান এর শেষ দশকের ই‘তিকাফ করতে চাইলে, সেক্ষেত্রে বিশ রামাদান দিনের শেষে সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বেই মসজিদে ঢুকে পড়বেন এবং যখন ঈদের চাঁদ দেখে নিবে বা বিধি মোতাবেক চাঁদ দেখার সংবাদ শুনবেন, তখন ই‘তিকাফ থেকে বের হয়ে যাবেন।
১১। শবে কদর : এ উম্মতের প্রাপ্ত গড় বয়স যেহেতু অন্যান্য উম্মতের লোকজনের তুলনায় স্বল্প হয়ে থাকে, সে কারণে মহান আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে একটি রাত এমন নির্ধারিত করে দিয়েছেন, যাতে ইবাদত করা একহাজার মাসের চেয়েও অধিক সময়কাল ব্যাপী ইবাদতের নামান্তর হয়ে যায়। কিন্তু সেটিকে গোপন রেখেছেন যেন মানুষ তা অনুসন্ধানে লিপ্ত হয় এবং এই সুযোগে অসীম সওয়াবের ভাগীদার হয়ে যায়। এই লায়লাতুল-কদর রাতটি মাহে রামাদানের শেষ দশকের বেজোড় রাতেই হওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক। অর্থাত্ ২১তম, ২৩তম, ২৫তম, ২৭তম ও ২৯তম রাত্রিতে এবং বিশেষ করে ২৭তম রাতেই তা হওয়ার সম্ভাবনা অধিক। এ সব রাতে অনেক পরিশ্রম করে ইবাদত, তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা এবং দু‘আ-মুনাজাতে কাটানো উচিত। একান্ত পুরো রাত যদি সজাগ থাকা শক্তিতে না কুলায় বা অবসর পাওয়া না যায়, সেক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব হয় জাগতে সচেষ্ট হবে এবং নফল নামায বা কুরআন তিলাওয়াত বা যিকির, তাসবীহ ও দুরূদ পাঠে ব্যস্ত থাকবে। একেবারে কিছুই করতে না পারলে, সেক্ষেত্রেও অবশ্যই এশা’র নামায ও ফজরের নামায জামাতের সঙ্গে আদায় করা চাই। হাদীস শরীফে এসেছে, এতেও রাত জাগরণের সওয়াব দেয়া হয়।
বরকতময় শবে-কদরের রাতে অধিক হারে এ দু‘আটি পাঠ করার কথা হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, যথা- (উচ্চারণ :) “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউন্ তুহিব্বুল-‘আফওয়া ফা‘ফু ‘আন্নী” ; অর্থাত্ ‘হে আল্লাহ্! নিশ্চিত আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন!’। (চলবে)
lলেখক : মুফতী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা